Showing posts with label Bangla Post. Show all posts
Showing posts with label Bangla Post. Show all posts

Friday, August 08, 2025

লাম লামা

আমাদের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন। কাঠ বাঙ্গাল। তাঁর হিন্দী ছিল ভীষন ভাবে বাঙ্গাল ঘ্যাসা  মানে হেভিলি এক্সেন্টেড। কিন্তু তাই বলে কি উনি আলাপচারিতায় পিছ পা ছিলেন। মোটেই না। বরং আগ বাড়িয়ে পথযাত্রীদের সঙ্গে  অশুদ্ধ হিন্দীতে ওনার বার্তালাপ-এর গল্পো ছিল আমাদের হাঁসির খোরাক।

যেমন বাস স্ট্যান্ডে বাসের জন্য অনেক ক্ষণ অপেক্ষারত থেকে সময়ে বাস না পাবার আক্ষেপ জানাতেন পাশের যাত্রীকে, "পইলে ২১৩ নম্বর বাস বহুত ঘন ঘন আতা থা। আজকাল ক্যা হো গেয়া। অনেক প্যারাশানি হোতা হ্যায়।" পাশের আগুন্তুকটি ও কি বুঝে মাথা নাড়িয়ে সায় দিতেন। 

একবার বাসে চড়ে মালভিয়া নগর যাচ্ছিলেন সেই মেসোমশাই। জায়গাটি অপরিচিত হওয়ায় বাসের কন্ডাক্টর কে উনি অনুরোধ জানালেন, " মালব্ব নগর আনে সে হামকো লামা দেনা"। কন্ডাক্টরটি ও ছিল রসিক বটে। স্টপ টি আসাতে উনি মেসোমশাইকে বল্লেন, "অব আপ লাম যাও"।

আমার মা বিবাহের পূর্বে অনেক বছর দিল্লীবাসিনী ছিলেন। সেই দেশ বিভাগের আগে মামাদের কাছে আসা তারপর আর ফিরে যাওয়া হয়নি। কিন্তু মার হিন্দীতে ও বাংলা টান ছিল প্রবল। মা কিছুতেই হ্যায় বলতে পারতেন না। হয়ে যেতো হায়। আমরা এ  নিয়ে প্রচুর হাঁসি ঠাট্টা করতাম।

আমাদের বাড়িওয়ালি ছিল ঠেট পাঞ্জাবি। কিন্তু মা দিব্যি ওঁর সঙ্গে আলাপ চালিয়ে যেতেন। উনি ওনার ভাষায় মা নিজের ভাষায়। পরে মাকে যখন আমরা জিজ্ঞেস করতাম উনি কি বললেন মা বুঝেছেন কিনা মা ঘাড় নাড়িয়ে জবাব দিতেন, "না"। ওনার ও অবস্থা নিশ্চই ছিল তথৈবচ কিন্তু দুজনে দুজেনের কথা সসম্মানে ও সাগ্রহে শুনতেন অধৈর্য্য না হয়ে। একেই বোধহয় সভ্যতা বা ভদ্রতা বলে।

তখন কার দিনের মানুষরা ভিন্ন প্রকারের ছিলেন। তাদের বোধ, সংস্কার, ভদ্রতা জ্ঞ্যান ছিল অন্য। আজ তাঁরা নেই । সেই মুল্যবোধ ও আর নেই।

Friday, September 16, 2022

মুষিক পুরাণ


আমাদের নিচের তলার ফ্ল্যাট। তাই প্রায়ই বাড়িতে ছোট  বড় নানান সাইজের ইঁদুর ঢুকে পড়ে। খেলাধুলা করে। নাচানাচি করে। আমার পোষ্যটি দার্শনিকের মতন তাকিয়ে তাদের নাচাকোদা, ছোটাছুটি দেখে ফোত করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। ল্যাও ঠ্যালা। 

ফ্ল্যাটের সামনেই পার্ক। সেই পার্কে আবার বিশাল বড় বড় সাইজের ইঁদুর, যাদেরকে ইংরেজিতে রোডেন্ট বলে, লাফিয়ে বেড়ায়। ব্যালকনিতে রাত্রে তাদের ডাকাডাকি, হুড়োহুড়ি শোনা যায়। চিকার দল ও আছে। তাদের কথোপকথন কানে আসে। এদের মধ্যে কোনটি যে গাড়ির মধ্যে ঢুকে তার কাটে, পাইপ কাটে বলা মুশকিল। তবে এ ঝঞ্ঝাট ও  আমাকে একাধিকবার পোয়াতে হয়েছে। 

মুষিকের আগমনে ইঁদুর কল, আঠা দেওয়া বই যাতে ইঁদুর চিপকে যেতে পারে ইত্যাদির ব্যবস্থা বাড়ির ভিতর রাখা অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

কিন্তু এত সব ব্যবস্থা সত্বেও এবার যাঁর  চরণ ধুলি আমাদের বাটিতে পড়েছে সে যে মহা ধুরন্ধর তা বেশ ভালোই বোঝা যাচ্ছে। ইঁদুর কলে ঘী দেওয়া রুটি থেকে মাংসের টুকরো দিব্যি সে আত্মসাৎ করে আমাদের কলা দেখিয়ে আশেপাশে ল্যাজ উঠিয়ে নির্লজ্জের মতন খেলে বেড়াচ্ছে। দেখে গা জ্বলে যাচ্ছে। অথচ কিচ্ছুটি করার উপায় নেই কারণ আমার "সক্রেটিস" পোষ্য নির্বিকার চিত্তে তাঁকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। একবারও থাবা উঠিয়ে শাসানো তো দূরের কথা ভৌ ভৌ পর্যন্ত করছে না।

শেষ পর্যন্ত আঠা লাগানো বইটিই কাজে এলো। ঘুরন্ত জামাই ( মহিলা কিনা জানিনা তবে জামাই আদরে বাঁদর হয়ে যাচ্ছে তাই জন্যে আর কি...) শেষে আঠা যুক্ত বইয়ে ধরা পড়লো। তাঁর শেষ সৎকার মানে তাঁকে বই থেকে ঝেড়ে পার্কে ফেলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হলাম। তবে আঠা মুক্ত হয়ে তাঁর শারীরিক অবস্থা খুব একটা সুখকর ছিল না। প্রায় নির্জীবই বলা চলে। দুর্ভাগ্য বসত: এক জোড়া কুকুর তাঁর পিছন নিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ইন্দুরটির কী দশা হয়েছিল বলতে পারবো না।

তবে তাঁর দুর্বল শরীর দেখে কষ্ট হচ্ছিল। যাইহোক জীব তো ! আর জীব হত্যা মহাপাপ। মানুষের জীবনের এটাই সবচেয়ে বড় contradiction।  যা সে পায় না বা যতক্ষণ পায় না ততক্ষণ সে ছটফট করে নানা বিধ উপায়  খোঁজে তাকে পাওয়ার  - তা সে কোনো প্রাপ্তি হোক বা বিপদ থেকে মুক্তি হোক। কিন্তু সফলকাম হয়েও সন্তুষ্টি থেকে সে ক্রোশ দূরে থাকে হয় আরো পাওয়ার লোভে বা পেয়েও অশান্ত চিত্ত হয়ে আর বিবেকের তাড়নায়  ছটফটিয়ে।

আশা করি একটি মুষিকের শেষ কৃত্যের ভাগী হয়ে আমি যেই দর্শন লাভ করেছি তদ্দারা আপনারা যথাযথ অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ  বোধ করবেন।

আচ্ছা রাখি তাহলে ..  

Friday, May 13, 2022

লাছুরি

 

আমার জীবনে কিছু দুক্কু  বরফের ড্যালার মতো জমা পড়ে আছে।  আজ সেগুলির একটা লিস্টি তৈরী করব ঠিক করেছি :

দুক্কু নম্বর ১

এটা আমার ছোটবেলার  দুক্কু 

আমাকে কেউ গান গাইতে বললে আমার স্মৃতি শক্তি ও গলার আওয়াজ দুই ই  লোপ পায়।  "কী গাব আমি কী শোনাবো ..." ছাড়া আর কোনো গান আমার মনে পড়ে না।  অথচ আমার চিরকালের স্বপ্ন  আর ডি বর্মন 'আমাগো  বাসার' সামনের রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে হারমোনিয়ামে আমার  সা - রে - গা - মা - পা - ধা - নি - সা রেওয়াজ শুনে বাড়ীর কলিং বেল বাজিয়ে আমায় কোলে তুলে নিয়ে একেবারে বোম্বে পাড়ি দেবে। কিন্তু  হলো না ..

দুক্কু নম্বর ২

ইটা আমার মেয়েবেলার  দুক্কু 

কত মেয়েরা কী সুন্দর ভাবে টান -টান করে মডেলের মতন শাড়ি পড়ে , মেক আপ করে , মিষ্টি দেখায়  ...আমি শত চেষ্টা করেও পারি নিকো।  ঠোঁটে লিপিস্টিক মাখলে কালো কালো ছোপ পড়ে।  চোখে কাজল আঁকলে চোখের তলায়  কালি  আরো প্রবল গাঢ় দেখায়। ফাউন্ডেশনের গন্ধ আমার সহ্য হয় না  - মাথা ধরে...গা ঘিন ঘিন করে   তাই এই দুক্কুটাও রয়ে গেলো গো  ...

দুক্কু নম্বর ৩

এটা আমার ধিরে ধিরে গড়ে ওঠা দুক্কু 

ছোটবেলায় আমি ভীষণ  লাজুক ছিলাম।  কেউ কোনো বাজে কথা বললেও তার উত্তর দিতে পারতাম না  - খুব খারাপ লাগতো।  দিনের পর দিন সেই বিষ মাখা কথাগুলো মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেত।   আর আমি উত্তর না দিতে পেরে মনে মনে গুমরাতাম।  তারপর উত্তর দিতে শিখলাম, রাগ করতে শিখলাম, রাগ দেখাতে শিখলাম এবং শেষ-মেষ রাগে ফেটে পড়তে শিখলাম।  ক্রোধ শনি  ... কে না জানে?  রাগের চোটে  মাঝে মধ্যেই   মাথা দপদপাতে শুরু করতে লাগলো . তখন রাগ কমাবার পন্থা গুলো অবলম্বন করতে শুরু করলাম।  পুরোপুরি ক্রোধ সম্বরণ করতে না পারলেও ভিসুভিয়াস হই  না আর বা হতে হতে থেমে  যাই. কিন্তু আমার দুক্কু হলো কিছু কিছু লোক দেখি কী সুন্দর রাগ চেপে রেখে মিষ্টি মিষ্টি করে  পিচিয়ে পিচিয়ে কথা শোনাতে  পারে তারপর কী অমোঘ কৌশলে ঝোপ বুঝে কোপটি মারে। আমি কেন তা পারিনা ? একদম পারিনা।

দুক্কু নম্বর ৪

 এটা আমার মানে এক্কেবারে এক্সেপশনাল  দুক্কু 

আমি অহেতুক এবং অনিয়ন্ত্রিত অন্তরঙ্গতা বা ভাবপ্রবণতা হ্যান্ডেল  করতে পারি না।  টু মাচ ইমোশন একেবারে নো নো।  মানে ওই ভাবের ফানুশ হয়ে গলে গলে  - ও:! এটা আমার দু:খ না অক্ষমতা ঠিক বলা কঠিন। মানে আমাকে যদি কেউ প্রেম নিবেদন করে - ভাগ্যিস কোনোদিন কেউ করে নি - আমার যে কী  প্রতিক্রিয়া হবে বা হতো  বলা মুস্কিল। একবার এক পাড়ার ছেলে  রাস্তায় আমাকে ,"আপনাকে অনেক কথা বলার আছে কিন্তু কেমন করে বলি বুঝতে পারছি না। .."  বলাতে আমি " তাহলে আর বলে কাজ নেই " বলে হনহনিয়ে চলে গেছিলাম।

দুক্কু নম্বর ৫

এটা আমার বড়বেলার দুক্কু 

আমি অনেক লেটে  গাড়ী চালাতে শিখি।  তার ও বেশ কিছু বছর পরে গাড়ী কিনি।  যতদিনে গাড়ী কেনার মুরোদ হলো ততদিনে গাড়ি চালানো ভুলে গেছি আর কি।  তারপর আবার শিখলাম। দু বার ই ড্রাইভিং স্কুলের গাড়ীতে।  ও গাড়ীতে কেউ চালানো শিখতে পারে না।  কারণ কন্ট্রোল থাকে পাশে বসে থাকা ড্রাইভারের কাছে। তাই আবার শিখলাম - এবার নিজের গাড়ীতে।  তিন মাসের ট্রেনিং ছ মাসে গড়ালো।  যিনি শেখাতেন তিনি টেনশনে টেনশনে বিড়ি ফুঁকে ফুঁকে গাড়ীতে বিড়ির এমন গন্ধ করে ফেললেন যে গাড়ীতে বসা দায়।  এক হরিয়ানার ড্রাইভার আমাকে শেখাতে  এসে রেগে-মেগে বলেছিলো ,"ম্যাডাম আপনি সব জানেন কিন্তু রাস্তায় বেরিয়ে কিছুই করেন না" - ম্যাডাম করবেন কী করে ম্যাডাম তো রাস্তায় নেবে ভয়ের চোটে বোধশক্তিরহিত হয়ে যান ।  আজকালকার ছোট্ট ছোট্ট মেয়েদের দেখি ততোধিক ছোট্ট ছোট্ট জামা পড়ে বিশাল গাড়ী নিয়ে ভোঁ ভোঁ করে চালিয়ে যাচ্ছে।  দেখে হিংসে হয়।  

দুক্কু নম্বর ৬

এটা আমার বুড়োবেলার  দুক্কু  

এই দুক্কু এমন দুক্কু "বোঝে কে আন জনে  সজনি আমি বুঝি মরেছি মনে মনে " - না কাব্যি করার কিছু নেই।  তবে এটা ঠিক যে এই দুক্কু নিয়েই আমি গত হব।  আমি কনজেনিটালি ওভারওয়েট।  ছোট্টবেলায় আমায় কেউ কোলে  নিতে পারতো না।  এখানে ছবি দিতে পারতাম -   থাক।  স্কুল ও কলেজ  এবং পরবর্তি  চাকুরী জীবনে আমি তন্বি হিসেবে খ্যাত ছিলাম।  তিরিশ পেরিয়ে সেই যে খেতাব হারালাম এখন ওইয়িং মেশিনে পা রাখতে ভয় হয় যদি ভেঙে যায় - লজ্জা . লজ্জা।  তবে একবার ডায়েট করে ১৫ কিলো ওজন কমিয়ে ছিলাম।  পাড়া প্রতিবেশীরা চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করতো , "তুমি কী অসুস্থ ?" তারপর শরীর এমন খারাপ হলো - গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট বললেন "ডায়েট করে কাম নাই।  নর্মাল খাবারে ফিরে  আসেন"।  আর আমি সেই যে ফিরলাম আর যাওয়া নাই।  তবে আমার এজেন্ডা না খেয়ে মরার নয় - . আমি খেয়ে বাঁচতে এবং মরতে চাই. - আই হোপ ভগাদা আমার এই ইচ্ছে টুকুর মান রাখবেন। 

যাক অনেক দুক্কের কথা ঢাক পিটিয়ে বললাম  .

 তবে এটা  জরুরি ছিল নয়তো আমার ববম হাজামের মতো অবস্থা হচ্ছিলো। পেট ফুলে ঢোল। 

বয়সটাও এমন .. হঠাৎ করে টেঁসে গেলে ভ্রাম্যমান পেত্নী হয়ে "কাকে বলি...কাকে বলি " করতে করতে মর্তলোকে ঘুরে বেড়াব আর যার তার কানে ফিসফিসাব।  

তাই আর কি লিখে রেখে গেলুম 


হালুম এন্ড হুলুম। 

Wednesday, April 20, 2022

দিশারী



আমার আবার দিক্ভ্রমের বাতিক আছে। 


এই  একটি কারণেই আমি গাড়ী ড্রাইভ করি না বললে ভুল হবে তবে এটা  অনেক গুলো কারণের  মধ্যে একটা ।  যেহেতু  আমার  চলন্ত যেকোনো বাহনে একাগ্রতার অভাব হয় সেহেতু দিক ভুল করা ও যে অসম্ভব নয় তাও নিশ্চিত। এই অদ্ভুত ব্যারামে অনেক ভোগান্তি আমার হয়েছে। কিছু কিছু ঘটনা বলি - 

বাড়ীর কাছের গলিতে ভুল করে ঢুকে পড়ে  ঘুরপাক খেয়েছি বহুবার।  বহুত রাস্তা ভুল করেছি। গলত  টার্ন নিয়েছি। আপনজনদের হাঁসি ঠাট্টার খোরাক হয়েছি।

একবার অটোতে বসে ডান  দিক বলতে বাঁ দিক বলে ফেলেছিলাম। অটো চালক রাগতঃ স্বরে  আমায় নিজের ডান  দিক  বাঁ  দিক ঠিক করে নিয়ে তারপর তাকে ডাইরেকশন দিতে  বলেছিল ।

 একবার রিক্সা করে বাড়ী ফিরছি হঠাৎ মাথাটা গড়বড় করে বসলো। তখন আমি পশ্চিম বিহারে থাকি। এই এলাকার সবচেয়ে বড়  মার্কেট জোয়ালাহেড়ী  থেকে সোজা নাক বরাবর গেলেই জী -এচ ১৪ ব্লকে  আমার বাসা ... কিন্তু কেন জানিনা সব গুবলেট হয়ে গেলো। তখন ভর  দুপুর। রিকশাওয়ালাকে খুব ঘাবড়ে গিয়ে বললাম ভাই আমার বাড়ীটা তো এখানেই ছিল।  কোথায় চলে  গেলো জানিনা। বিহারী রিকশাচালক রসিক ছিল, বললে "সারা দিন পড়ে আছে, খুঁজে নিন। " ভাব ..

তবে তৃতীয় ঘটনাটি মারাত্মক হয়েছিল। ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ নিয়ে রাস্তায় নেমে ছাই রঙা ওয়াগন আর  দেখে দরজা খুলে ড্রাইভারের পাশের  সিটে  বসেই  হুকুম দিলাম, "চল "...গাড়ী স্টার্ট দিচ্ছে না দেখে পাশে তাকিয়ে  দেখি একটি গোল পানা অচেনা মুখ -  শ্যামল বরণ , একজোড়া হৃষ্টপুষ্ট গোঁফ আর বড় বড় বিস্ফারিত  চোখ।  বিস্ফারিত বলবো না -  বিস্মিত  , অভিভূত , রোমাঞ্চিত - সব কিছু মেলানো সেই  লোম খাঁড়া করা দৃষ্টি  কী বলবো আর !!  আমি সেকেন্ডের মধ্যে বাইরে।   

আর একটি ছাই রঙা ওয়াগন আর পিছনে দাঁড়ানো দেখে বুঝলাম কোথায় গন্ডগোলটা করেছি। এর পর থেকে নিজের গাড়ীতে বসার আগে গাড়ীর  নম্বর চেক করার  অভ্যাস করেছি। কিন্তু নম্বরেও যদি গোল করি তাহলে আর কী কী পন্থা আছে এই ব্যারাম থেকে মুক্তি পাওয়ার ভাবতে হবে..

হ্যাঁ ..আরেকটা  কথা 

যেই অচেনা ভদ্রলোকের গাড়ীতে বসে পরম আত্ম-বিশ্বাসের সঙ্গে গাড়ী চালানোর হুকুম দিয়েছিলাম তাঁর স্ত্রী গাড়ীর  কাছাকাছি ছিলেন কিনা জানিনা। একজন আজনবি মহিলাকে গাড়ীতে বসে কিছুক্ষন পরে ছিটকে বেরিয়ে আসতে দেখে তাঁদের বৈবাহিক জীবনে পরবর্তীকালে কোনো গোলযোগ বেঁধেছিলো  কিনা  সেটা জানার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও জানবার কোনো সুযোগ বা উপায় হয়নি । 

হবে কী করে ? ভদ্রলোককে আরেকবার পথে-বিপথে দেখে চিনতেই পারবো না।  তবে হ্যাঁ। .ওনার সেই অবিশ্বাস্য ভরা কেতো -কেতো  চাহনি জীবনে ভুলবো না....... ... সেটা ঠীক।  

Monday, April 18, 2022

বয়:ধর্ম


       
বয়স বাড়ছে ..না: ...হলো না...বুড়ো হচ্ছি বুঝতে পারছি। 

সকালে ঘুম থেকে উঠে আবার গা এলিয়ে দিতে ইচ্ছে করে ..বিছানায় 

চা খেতে বসে মনে হয় আরেকটু বসে থাকতে পারলে  বেশ হতো .. সোফায় 

রান্না ঘরে ঢুকে মনে হয় উফ আবার রান্না ..ধ্যুত !

অফিসে না যেতে পারলে কেমন হতো ..ভালোই হতো আর কী ?

গাঁটে গাঁটে নানা প্রকারের ব্যাথা বেদনার কথা নাই বা পারলাম ..

অনেক কিছু আগে খেতে ভালো লাগতো .. রসিয়ে রসিয়ে রান্না করে  আঙ্গুল চেটে খাওয়া  - উঠে গেছে। পেটে   সয় না .

আয়নার  সামনে  অনেকক্ষণ  ধরে  দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে ভালো লাগতো  নানান এঙ্গেলে ... এখন চুলের পাক ধরাটা বেশি নজর কাড়ে ..সরে আসি।  কাকে দেখছি ? এই কি সেই আমি????

খুব তাড়াতাড়ি  বিরক্ত  হয়ে যাওয়ার বাতিক  হয়েছে..মনে হয় চুপ করে বসে থাকি ..ওই লোকটা কী যে ঘ্যান ঘ্যান করছে  .... সে যেই হোক না কেন 

একটা ভয় ঢুকেছে . এর পরে কী হবে ..আজ যেটা করতে পারছি কাল যদি না পারি তবে ?

নার তালিকাটা লম্বা হয়ে যাচ্ছে ..

দুপুরে নাক ডেকে ঘুমোবার স্বভাবটা চিরকালের।  এখন সেটা বিপজ্জনক লেভেলে  দাঁড়িয়েছে। যেকোনো সময়  যেখানে ইচ্ছে। 

সে যেখানেই হোক ঘুমে ঢুলে পড়তে দেরি  লাগে না।  একদিন তো ক্যাবে..  ড্রাইভার মশাই আগেই দর দস্তুর করে নিয়েছিল - সিএনজির দাম বেড়েছে।  আপনি যদি এসি চান তাহলে আমাকে ডাইরেক্ট পেমেন্ট করে দিন. আমি বললাম না এসির দরকার নেই. বলতে বলতেই ঘুমে ঢুলে পড়লাম। গাড়ির খোলা জানালা দিয়ে "প্রখর তপন তাপে ..এ .এ .এ " এমন ভাবে নাক ডাকিয়ে কেউ ঘুমোতে পারে ক্যাব চালকের বোধহয় ধারণার বাইরে।  অনেকবার ধুম ধুম করে ব্রেক কষেও  জাগাতে না পেরে গম্ভীর মুখে আমায় অফিস অবধি ছেড়ে দিয়ে বোধ করি  স্বস্তির নি:শ্বাস ছেড়ে বেঁচেছে। 

আরও অনেক এরকম ছোট ছোট ব্যাপারে বুঝতে পারি পৃথিবীতে অনেক দিন কাটিয়ে ফেলেছি। 

কিন্তু এখনো "সাধ  না মিটিল আশা না পুরিলো সকলি ফুরায়ে যায় মা ..আঁ  ..আঁ  ..আঁ "

গলায় আজকাল  তেরোটা সুর খেলছে  - এ টা আরেকটা ইন্ডিকেশন..

এবার  রাখি 

আর বোর  করবো না। 

Monday, April 04, 2022

কুঞ্চি-বুঞ্চির মা ডেপি




"আরে ! কী  খবর ? কেমন, ভালো তো ?"

"হু:! আর কী  ভালো?"

"কেন ? আবার কী  হলো ?"

"হলো মানে ? আপনি জানেন না?"

"কই  না তো ?"

"এঃ ? কোথায়  থাকা হয় মশাইয়ের ? কোনো খোঁজ খবরই  রাখেন না দেখছি।  পাড়ায়  কী  হচ্ছে না হচ্ছে .....যায় আসে না বুঝি ?"

"যায় আসে না মানে? যায় আসবে না কেন বলছেন?"

"বা রে ! এতো বড়ো কান্ড ঘটে গেলো আর আপনি কী মশাই খোঁজই রাখেন না। "

"আরে কী মুশকিল ! কী হলো তা না বলে আবার সেই আবোল তাবোল..."

"শুনবেন ? শুনতে চান?"

"হ্যাঁ ! হ্যাঁ রে হ্যাঁ ! বলুনই  না কী ব্যাপার... "

"তবে শুনুন..আমাদের ডেপি ..কী বলবো মশাই ..ছ্যা: ছ্যা: ...শুনে অবধি...কী বলবো আর (গলা নামিয়ে) ডেপি আমাদের পোয়াতি হয়েছে।  কী  কেচ্ছা ... কী  কেচ্ছা !"

"ছেলেটি ক্যাডা ?"

"সে তো বেপাত্তা। "

"এ: ? কী বলেন মশাই ?

" তাও জানেন না মশাই ? আপনাকে নিয়ে আর পারা গেলো না।  এত  বড় একটা কান্ড ঘটে গেলো পাড়ায়  আর আপনি...."

"কী করবো বলুন ? চাকুরে মানুষ।  সকালে বেরিয়ে রাত্রে ফিরি। কী  করেই বা এতো খবর রাখি বলুন ? তা মা আর বাচ্চা ভালো তো? দেখাশোনার ভার তাহলে কে বা করা...."

"আরে ছাড়ুন মশাই।  আবার দেখাশোনা। সারা পাড়া  দেখা শোনা করছে।"

"সারা পাড়া ? সমাজের তাহলে উন্নতি হয়েছে বলুন। সবাই মিলে  যখন  ভার সামলাচ্ছে তখন  সামাজিক দায়দায়িত্বর  মাপ বেড়েছে।  কী বলেন ?"

"এঃ ?" কিছুক্ষন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে , " কী যে বলেন ?শুধু মা নাকি ? তার আবার দু দু খান...আমার উনি আবার আদর করে নাম রেখেছে কুঁচি আর বুঁচি।  উফ আর পারি না। "

"বা: ! খুব সুন্দর  মিষ্টি নাম..."

"হু:"

"তা অন্নপ্রাশন টাশন   কবে?"

"এ:...? কুকুরের বাচ্চার আবার অন্নপ্রাশন ? আপনার মাথা খারাপ নাকি?"

"কু..."

"আপনি  কী ভাবলেন মানুষের? ছো :...ছো: ..."

"উফঃ!  আগে বলবেন তো। তখন থেকে।"

"তবে আরেকটা খবর আছে ," গলা খাটো করে , "সেটা কিন্তূ  মানুষ 
সংক্রান্ত .."

"আরেকদিন শুনবো দাদা।  একটু তাড়ায়  আছি। অফিস যেতে  হবে... চলি। "

হন হন করে এগিয়ে গেলেন।

"যা বাব্বাঃ !" মাথা নাড়তে নাড়তে , "কেমন ধারার লোক।  কুকুরের গল্প এতক্ষন ধরে মন দিয়ে শুনলো।  আসল  কথা শোনার সময় কাজের তাড়া।  হু:..."
 

Sunday, March 26, 2017

“সহজ পাঠ”



আমার বাংলা শেখা গল্পের বই পড়ে। ব্যাকরণ সম্বন্ধে আমার জ্ঞ্যান সীমিত। তবু ও বাংলায় লিখে যে সুখ তা ইংরাজি বা হিন্দিতে লিখে পাই না। না একটু ভুল বললাম। তিনটি ভাষার তিন রকম উপলব্ধি।


ছোটোবেলা থেকে বাংলা ও ইংরেজিতে অনবদ্দ্য ভাবে নানা রকমের বই পড়েছি – উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা, বিবিধ সাহিত্যিকের রচনাবলি আর সিলেবাসে যে সব পাঠ্যপুস্তক ছিল তাতো বটেই। হিন্দিতে পাঠ্য পুস্তক ছাড়া বিশেষ কিছু পড়া হয়নি। তবে হিন্দি গান শুনে-শুনে ভাষার সূক্ষ্ম আবেদনগুলি বোঝার চেষ্টা করেছি। হ্যাঁ! সত্যিই! গান ও যে সাহিত্যের একটা নিবিড় অঙ্গ সেটা আমরা প্রায়সই ভুলে যাই।


এখন অবশ্য আমার ব্লগার বন্ধু শ্রী জে মাথুরের লেখা হিন্দি পাল্প ফিকশনের অনেক রিভিউ পড়ে হিন্দি গল্পের বই পড়ার মনে ইচ্ছে জেগেছে। তবে যে কোনো ভাষা ‘ফীল’ না করতে পারলে সেই ভাষায় বই পড়ার আনন্দ নব্বুই শতাংশ কমে যায়।তাই ইচ্ছে করলে ও পড়ে কত খানি আনন্দ লাভ করব সেটা অনুমান সাপেক্ষ।


তবে তিনটে ভাষাতেই লেখালেখি করে দেখেছি নিজের মাতৃ ভাষায় লেখা সব চেয়ে স্বাছন্দে হয়।আসলে যেহেতু ভাবি বাংলায় তাই লিখতে গিয়ে ভাবার ভাষা অনুবাদ করতে হোঁচট খেতে হয় না যটা হয় ইংরেজি আর হিন্দিতে লিখতে।


তাই প্রাণের ভাষা মনের ভাষার আমাদের বাংলা ভাষা।



ঠীক কী না?          

Thursday, October 01, 2015

উফ্!!!




উফ্!!!




উফ্!!!
 
এই শব্দটা ভোলার যো নেই…বিশেষ করে আজকাল কার যুগে যেখানে  অসহিষ্ণুতা মানুষের জীবনধারায় অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত …।
 
ভোর চারটা …
 
এ্যালার্ম ঘড়ীটা বিচ্ছিরী ভাবে কঁকিয়ে উঠল...
হাথ বাড়িয়ে বন্ধ করতে করতে আরো কয়েক সেকেন্ড...ততক্ষণে কোঁকানোটা মরা কান্নার পর্যায় পৌঁছিয়েচে...
 
ঠান্ডা মাথায় খূন করি ......... না মানুষ নয় ... এ্যালার্ম ঘড়ীটার... সোজা......... গলা টিপে।
 
পাশ ফিরে শুই ... আর কিছুক্ষণ আলসেমির আনন্দ নিই আর কী।
 
ঘড়ীর কাঁটা থামে না কিন্তু ... টিক্... টিক্... টিক্... টিক্... টিক্... টিক্
 
তাতে কী? ভুলে যাই সময় কাল পাত্র এক নিমেষে... তারপর ............খেই হারানো নৌকার মতন উথাল পাথাল সমুদ্রের পাড়ি...
 
চোখ খুলতেই চরক্ গাছ ... উফ্ দেরি হয়ে গেছে ... ভীষণ...!!!
 
দৌড়ে লাগুর পাই না... (এমারজেন্সিত মাটির ভাষাটা বড়ই মিঠে, সহজ, প্রাণের ভাষা লাগে...!!)
বাথরুমের দর্শন ....ঢোকা আর বেরোনো আর কি!!
 
হোঁচোট খেলাম... আউচ!!!
 
তারপর রান্নাঘর............মাঝে মাঝে আজীবন কারাবাসের মতন লাগে।। কিন্তু হিন্দীতে ওই যে বলে “পাপী পেট কা সওয়াল হ্যায় বচ্চা” ওই আর কি!!
 
চাটা বেশী কড়া হয়ে গেল... উফ্!
ডালটায় নূন এক চামুচের জায়গায় দুই চামুচ পড়ে গেল...  উফ্!
উচ্ছের তরকারি কড়াইয়ে লেগে গেল... উফ্!
দুধ উথলে ফ্লোর ভাসালো ... উফ্!
কাজের লোক আছে...কিন্তু আজ না বলে ছুটি করে ফেলল না বেল বাজিয়ে উত্তর না পেয়ে চলে গেছে বুঝতে পারলাম না... উফ্!
 
গীজারটা হঠাৎই ‘মিস-বিহেভ’ করল... উফ্!
নভেম্বর মাস...ঠান্ডা জলে চান করলে একটু শিরশিরে ভাব জাগে...আলতো উষ্ণ হলে ভালো হয়............হলোনা, উফ্!
 
তৈরি হতে গিয়ে আবার গড়বড়  ...
তাড়াহুড়োয় কিছু একটা গলিয়ে চলে যাব ভেবেছিলাম ......প্রেস করা নেই......... উফ্!
উফ্!
প্রেস করতে আরো এক পশলা দেরি ......... উফ্!
 
অগত্যা কোনো রকমে বাড়ীর বার...যাত্রা বিভ্রাট... সে তো লেগেই আছে । দিন ক্ষণ দেখে আসে না...
 
অটো পেতে দেরি......
দেরি বলে রাস্তায় যানজট...
অফিসে তাই পৌঁছতে দেরি...
দেরিতে পৌঁছে কাজ শেষ করতে দেরি...
কাজ শেষ করতে দেরি দেখে বসের দাঁত খিঁচুনি...
দাঁত খিঁচুনি শুনে মুড অফ্...
মুড অফ্ মানে বাকি  দিনটার বারোটা পাঁচ...
 
উফ্! উফ্! উফ্! উফ্! উফ্! উফ্! উফ্!
 
আর বাড়ী ফিরে...............
 
যাক্ সে কথা নাই বা পারলাম
মোদ্দা কোথায় আসি
 
মশাই,  তাই জন্যই তো শুরুতেই বলেছি ‘উফ্’ এর সঙ্গে ‘দোস্তি’ আমাদের জীবনের, না, জীবনযাপনের (লাইফস্টাইলের) এক বিশাল পাওয়া। এই পাওয়াকে আমরা মেনে নিয়েছি না মেনে নিতে পারছি না, সেটাই  ‘থ্রেডবেয়ার’ (সুতোছেঁড়া???) বিশ্লেষণের বিষয়বস্তু...
 
জানতে ইচ্ছা রইল আপনারা এই ব্যাপারে কী বক্তব্য রাখেন...
 


Friday, May 22, 2015

এবার থুড়ি গতবার পুজোয়







 
(শুরু করেছিলাম “এবার পুজো” দিয়ে কিন্তু  পোস্ট করছি “সেবার পুজো” বলে…। আলসেমি আর কি????)
 
কিছু করিনি বললে ভুল হবে। করেছি কিন্তু মন ছিল না। টেনশন ও ছিল কম না। মাকে নিয়ে পুজো প্যান্ডেলে যাওয়া ...।মার বয়স বিরাষী বছর তাঁর উপর রিসেন্টলি একটা বদ-খদ রোগের স্বীকার হয়েছেন। পুজোর কিছু দিন আগে নিউ রাজিন্দর নগর থেকে হুইল-চেয়ার কিনে আনা হ’ল যাতে দরকার হ’লে মাকে তাতে বসিয়ে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। তবে ভগবানের দয়ায় হুইল-চেয়ারটি একদিন (অষ্টমীর সন্ধ্যাবেলা) ছাড়া আর কোনো দিন ব্যবহার করতে হয়নি। মাকে শুধু এক হাতে লাঠি আর আরেক হাতে শিবার (আমার বোনপোর) কাঁধে ভর দিয়ে প্যান্ডেলে  ঢুকতে দেখে কী যে আনন্দ হয়েছিল বলার নয়। ভাবিনি যে মা আগের মতন নিজের পায়ে হেঁটে গাড়ী থেকে মায়ের পুজো মন্ডপ অবধি আসতে পারবেন।


সবই মায়ের দয়া...


মাকে নিয়ে আশ্বস্ত হলাম বটে কিন্তু প্যান্ডেলের অবস্থা দেখে যাইপরনাস্তি বিচলিত বোধ করলাম। দশ বছর আগে পুজো প্যান্ডেলে ছিল রমরমা অবস্থা   এখন লোক হাতে গোনা যায়। মাসী-কাকীদের ঠাকুরের বেদীতে পুরোহিত মশাইকে পুজোতে সাহায্য করতে দেখা গেল। আর দেখা গেল রিটায়ার্ড জ্যাঠা–কাকাদের পুজোর অন্য সব ব্যাবস্থা সামলাতে। কিন্তু বাচ্চা–পার্টি যে লোপাট। নেই সেই কিশোর-কিশোরীর দল যারা প্যান্ডেল রাঙিয়ে আড্ডা জমাতো। আজকালকার দিনে এম এন সির কাজে ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব – পুজো যায় যাক। আবার পুজো কে দেখে? সন্ধ্যার সময় আরতির সঙ্গে কোমর দুলিয়ে হিন্দি –ফিল্মের স্টাইলে দু-তিনবার নাচলেই তো হল।


তাই হ’ল...


ষষ্ঠির দিন কালি বাড়ী...


অফিস থেকে ফেরার রাস্তায় প’ড়ে। নেবে পড়লাম। আমার বাহন চালক এসব ব্যাপারে ভীষণ উৎসুক ও উৎসাহী । সেও আমার সঙ্গে নেমে মায়ের মূরতি দেখে তারীফ না করে পারল না ।   


সৌভাগ্যক্রমে আমরা  পৌঁছনোর  সাথে-সাথে মন্দিরে আরতি শুরু হল। আর তার সঙ্গে আরম্ভ হল পাঁচ জোড়া ঢাকীর ঢাক বাজীয়ে তালে তাল দিয়ে নৄ্ত্য। এই মনোরম দৄশ্যের ছবি তুলতে ভুলিনি...












সপ্তমির দিন অফিস...


এবার পুজোয় ছুটি নিইনি। মার অসুস্থতার জন্য আগেই অনেক নিয়ে ফেলেছি। অবশ্য অফিস ফেরত প্ল্যান হল সোজা নিবেদিতা কলোনির (পশ্চিম বিহার) পুজারতি দেখার। দিদি, জামাই বাবু আর শিবা মাকে নিয়ে এল বাড়ী থেকে। কিন্তু এ কি? প্যান্ডেল যে প্রায় ফাঁকা। আগে পুজোয় প্যান্ডেলেই প্রায় সারা দিন কাটত। এখন সেই কমিউনিটি গ্যাদারিং এর মাহাত্য কমে গেছে। আমার এক বরিষ্ঠ সহকর্মী গত বছর তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, “পুজোয় এখন আর কে ছুটি নেয়? যা দেখার সব তো রাত্রে। দিনে অফিস করুন না।”


তবে সপ্তমির রাতে মাকে হেঁটে প্যান্ডেলে ঢুকতে দেখে মন আনন্দে ভরে গেল। ভাবিনি মাকে আবার সুস্থ অবস্থায় চলে ফিরে বেড়াতে দেখতে পাব। এবার পুজোয় এটাই সব চেয়ে বড় পাওয়া।


অবশ্যি পুজোর আমেজ আর আগের মতন নেই। গ্লোবলাইজেশনের যুগে মানুষ যেমন চিন্তা ধারার সীমিত গন্ডি অতিক্রম করে এক বিশ্ব ব্যাপক পরিধির মধ্যে নিজেকে দেখতে শিখেছে তেমনি আবার নিজের প্রান্তের সাংসকৄতিক বৈশিষ্টগুলিকে, ভুলতে বসেছে বললে ঠীক বলা হবে না, বরং বলব হয় এড়িয়ে চলতে শিখে গেছে নয় তার সঠিক মুল্যাংকন করতে অক্ষম হয়েছে। ব্যাপকতা মানব জাতিকে উদারচেতা হতে সাহায্য করে। তার বিচার ধারা ও দৃষ্টিকোণকে আরো বড় পরিমাপ ও পরিধি দেয়। কিন্তু তার মানে কি এই যে আমরা নিজেদের প্রান্তিক বৈচিত্র্য ও  বিশিষ্টতাগুলিকে বিসর্জন দেব? আমাদের সংস্কৃতি আমাদের গড়ে ওঠা ও বড় হওয়ার বিরাট মহত্ত্বপূর্ণ এক  অঙ্গ সেটা ভুলে গেলে বা সেটাকে বাদ দিলে কী করে চলবে? আরেকটা কথা যেটা প্রায়শই আমরা অগ্রাহ্য করে যাই সেটা হল আমাদের উত্তরসূরির প্রতি আমাদের দায় দায়িত্ত্ব। তাদের জন্য আমরা কী রেখে গেলাম?  আমার এ যুগের বন্ধু বান্ধবরা সময়াভাব, সামাজিক ও আর্থনৈতিক পরিবর্তন ও তারই সঙ্গে নিজস্ব রুচির বিবর্তনের দোহাই দেন। আমি সম্পূর্ণভাবে তাঁদের সঙ্গে এক মত হতে পারছি না।


মানলাম সময় পালটে গেছে এবং তার সঙ্গে অর্থোপার্জনের জটিলতা, জীবন নির্বাহের দায়বদ্ধতা এবং নানান প্রেশার, স্ট্রেস ইত্যাদি কিন্তু তাই বলে আমাদের প্রদেশের এত বড় একটা ঐতিহ্য এমন ভাবে নষ্ট হয়ে যাবে? ভাবতেও খারাপ লাগে।


অষ্টমীর দিন পুষ্পাঞ্জলী


মাস্ট। এবার ও  বাদ পড়ল না। তবে মা কে একটু বিষন্ন লাগল। ভক্তের দলের  এ্যটেন্ডেন্স যে এত কম হবে মা বোধহয় এতোটা আশা করেন নি। আমরা কী তাহলে ব্যাপক নাস্তিকতার দিকে অগ্রসর হচ্ছি? এটাই কী বস্তুবাদের চরম মাশুল? আবার প্রশ্ন ওঠে মনে – মূর্তি পুজা বা রিচুয়ালিজম না মানাই কী নাস্তিকতার লক্ষণ? আস্তিকতার একটা বৄহত্তর পরিভাষা কে অগ্রাহ্য করাটা ও সঙ্কীর্ণমনতা নয় কী?


তবে সন্ধ্যারতির সময় আবার ফিরে পেলাম সাবেকী রমরমা ... ধুনুচি নৄত্য, হৈ-হট্টগোল, আমোদ, হাঁসি-তামাশা আর সদল বলে আরতি দেখার ধুম!!! যাক এখন ও


আশা আছে...।


নবমী ও দশমীর  দিন বাড়ীতেই কাটল


পাঠকেরা বলবেন, অ্যাঁ! একি হল?” এতো সমীক্ষা, পর্যালোচনা ও নিন্দেবাদের পরে এই? হ্যাঁ, তাই। অনেক ঘুরে শেষে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাই নবমী ও দশমী দুইই বাদ পড়ল মাতৄ-দর্শণ। হয়তো আমারই মতন গোটা চাকুরীজীবীর দল ২৪x৭ জীবন নির্বাহ ও অর্থোপার্জনের তাগীদে ছুটে-ছুটে এতোই শ্রান্ত যে সামাজিক মেলামেশার দায়দায়িত্বর চেয়ে ছুটির দিনে গা এলিয়ে ঘরে পড়ে থাকাকেই প্রাধাণ্য দেয় আর মাকে মনে-মনে স্মরণ করে বলে, “ পাপ নিও না, মা। কর্তার ইচ্ছায়ই কর্ম। এও বুঝি তোমারই ইচ্ছা”।