Showing posts with label বাংলা ব্লগ. Show all posts
Showing posts with label বাংলা ব্লগ. Show all posts

Friday, August 08, 2025

লাম লামা

আমাদের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন। কাঠ বাঙ্গাল। তাঁর হিন্দী ছিল ভীষন ভাবে বাঙ্গাল ঘ্যাসা  মানে হেভিলি এক্সেন্টেড। কিন্তু তাই বলে কি উনি আলাপচারিতায় পিছ পা ছিলেন। মোটেই না। বরং আগ বাড়িয়ে পথযাত্রীদের সঙ্গে  অশুদ্ধ হিন্দীতে ওনার বার্তালাপ-এর গল্পো ছিল আমাদের হাঁসির খোরাক।

যেমন বাস স্ট্যান্ডে বাসের জন্য অনেক ক্ষণ অপেক্ষারত থেকে সময়ে বাস না পাবার আক্ষেপ জানাতেন পাশের যাত্রীকে, "পইলে ২১৩ নম্বর বাস বহুত ঘন ঘন আতা থা। আজকাল ক্যা হো গেয়া। অনেক প্যারাশানি হোতা হ্যায়।" পাশের আগুন্তুকটি ও কি বুঝে মাথা নাড়িয়ে সায় দিতেন। 

একবার বাসে চড়ে মালভিয়া নগর যাচ্ছিলেন সেই মেসোমশাই। জায়গাটি অপরিচিত হওয়ায় বাসের কন্ডাক্টর কে উনি অনুরোধ জানালেন, " মালব্ব নগর আনে সে হামকো লামা দেনা"। কন্ডাক্টরটি ও ছিল রসিক বটে। স্টপ টি আসাতে উনি মেসোমশাইকে বল্লেন, "অব আপ লাম যাও"।

আমার মা বিবাহের পূর্বে অনেক বছর দিল্লীবাসিনী ছিলেন। সেই দেশ বিভাগের আগে মামাদের কাছে আসা তারপর আর ফিরে যাওয়া হয়নি। কিন্তু মার হিন্দীতে ও বাংলা টান ছিল প্রবল। মা কিছুতেই হ্যায় বলতে পারতেন না। হয়ে যেতো হায়। আমরা এ  নিয়ে প্রচুর হাঁসি ঠাট্টা করতাম।

আমাদের বাড়িওয়ালি ছিল ঠেট পাঞ্জাবি। কিন্তু মা দিব্যি ওঁর সঙ্গে আলাপ চালিয়ে যেতেন। উনি ওনার ভাষায় মা নিজের ভাষায়। পরে মাকে যখন আমরা জিজ্ঞেস করতাম উনি কি বললেন মা বুঝেছেন কিনা মা ঘাড় নাড়িয়ে জবাব দিতেন, "না"। ওনার ও অবস্থা নিশ্চই ছিল তথৈবচ কিন্তু দুজনে দুজেনের কথা সসম্মানে ও সাগ্রহে শুনতেন অধৈর্য্য না হয়ে। একেই বোধহয় সভ্যতা বা ভদ্রতা বলে।

তখন কার দিনের মানুষরা ভিন্ন প্রকারের ছিলেন। তাদের বোধ, সংস্কার, ভদ্রতা জ্ঞ্যান ছিল অন্য। আজ তাঁরা নেই । সেই মুল্যবোধ ও আর নেই।

Saturday, June 28, 2025

পথিক! তুমি কি পথ হারাইয়াছো?

জীবনে প্রতি নিয়ত অনেক লোকের সংস্পর্শে আসা এবং তাঁদের আমাদের ব্যক্তিত্বের ও জীবন যাত্রার উপর নানা বিধ প্রভাব - এই অনুভূতি, এই আদান প্রদান, এই অভিজ্ঞতাগুলিই জীবন যাত্রার পাথেয় হয়ে দাঁড়ায়। এই সহ যাত্রীরা সব সময় আপনজনের তালিকা ভুক্ত নাও হতে পারে। অনেক এমন লোকের সাহচর্য পাওয়া যায় যারা প্রাথমিক ভাবে সম্পূর্ণ রূপে অপরিচিত কিন্তু তাঁদের ক্রমাগত সান্নিধ্য  তাঁদের আন্তরিক ভাবে পরিচিত  ও আপন করে তোলে। তাঁরা কখনো বন্ধু কখনো বরেণ্য কখনো অযাচিত ভাবে উপকার করে আমাদের ঋণগ্রস্ত করে রাখে সারাটা জীবন।

আবার কিছু কিছু এমন লোক আছে যারা আমাদের জীবনে কিয়ৎক্ষণ দেখা দেন আর তারপর কোথায় মিলিয়ে জান। তার মানে এই নয় যে তাঁরা স্মৃতি থেকে অবলুপ্ত হয়ে যান। বরঞ্চ এর উল্টোটাই হয় - তাঁরা বার বার মনের দরজা দিয়ে উঁকি মারেন। ভাবি এঁদের সঙ্গে যদি আরো ঘনিষ্ট পরিচয় হত তাহলে জীবনটা কি অন্য খাতে বইত?

তিনটি উদাহরণ দিই।

কলকাতায় কর্মসূত্রে কিছুকাল থাকাকালীন প্রায়শই দক্ষিণেশ্বরে যাওয়ার সুযোগ পেতাম। মায়ের মন্দিরের সামনেই নাট মন্দিরে সন্ধ্যাকালে গানের আসর বসত। ভক্তিরসে সিক্ত সেই সব সভায় সম্মিলিত হওয়া বিশেষ ভাগ্যের ব্যাপার মনে করতাম। এইরকমই একটি শ্যামা সঙ্গীতের আসরে এক মাদল বাদকের ব্যক্তিত্বে আকৃষ্ট হই। লম্বা মেদহীন গঠন । সুপুরুষ বলা চলে। খুব প্রাণ দিয়ে মাদল বাজালেন। মনে হলো বাদ্য যন্ত্রের মাধ্যমে যেন মায়ের আরাধনা করছেন। পরে তাঁর আরেক ব্যক্তির সঙ্গে কথপোকথন শুনে জানতে পারি যে উনি অনেক বছর পড়াশোনা শেষ করে বেকার ছিলেন। তখন মায়ের মন্দিরে প্রায় আসা যাওয়া করতেন। ইদানিং বিদেশে কর্মরত হওয়ার দরুন মায়ের দরবারে নিয়মিত হাজিরা দিতে অসমর্থ হলে ও যখনই সুযোগ পান চলে আসেন। শুনে মনে হয়েছিল এই লোকটিকে আরেকটু ভালো ভাবে জানতে পারলে মন্দ হত না। তবে সে সুযোগ আর হয়নি।

দ্বিতীয় জন আমার বাসের সহযাত্রী। প্রতিবেশী ও বটে। মাঝারি গড়ন। একমুখ দাঁড়ি। মধ্যবয়সী। কোনোদিন কথা হয়নি। পাশে বসেও না। ভদ্রলোকের মধ্যে একটা খেলোয়াড় খেলোয়াড় ভাব ছিল। হয়তো আলাপ হলে আরো ভালো ভাবে তাঁকে জানা যেত। হয়তো পরিচিতির ফলে আকর্ষন ও কিছুটা কমত। কিন্তু কোনোদিন তাঁর সঙ্গে কথপোকথন হয়নি এমনকি আবহাওয়া নিয়েও নয়। তারপর একদিন জানতে পারলাম ...যাক সে কথা...

তৃতীয় ঘটনাটি আরো মর্মান্তিক। বেঁটেখাট মানুষটি আমার সঙ্গে কথা বলতে ভীষণ উদগ্রীব। পাতলা শরীর। মাথাটা দেহের অনুপাতে বড়। আলাপ করতে চেয়েছিল। আমি করিনি। "অনেক কথা বলার আছে কিন্তু কী করে বলি বুঝতে পারছি না"। মনে মনে বলি, "তাহলে আর বলে কাজ নেই"। মুখ ঘুরিয়ে রাস্তা পার হই। এর পর আর কোনোদিন কথা বলার চেষ্টা সে করেনি।  কিন্তু একদিন আমার ব্যাগ থেকে টাকা পড়ে যেতে সেটা সসম্ভ্রমে আমাকে তুলে দেন। এখন ভাবি আমার তাঁর প্রতি এত উদাসীনতা হয়তো তাকে মনে কষ্ট দিয়েছে। হয়তো সে একজন নিপাট ভালো মানুষ ছিল। দু একটা কথা বললে কারোরই কোনো ক্ষতি হত না। কিন্তু সে সময় পেরিয়ে গেছে। রেখে গেছে শুধু আফসোস।

এরকম আরো অনেক ঘটনা... বলতে গেলে রাত কাবার হবে। এখন মনে করেও কোনো লাভ নেই। কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ মনের দরজায় এরা টোকা যে মারে! তখন ভাবি এই সব বিস্মৃত মানুষরা কেন আসে মনের আঙিনায়? কি চায় তাঁরা? আমি কি চাই? এদের নাম দিতে?  কি নাম দেব? এদের পরিচয় কি? এরা তো সব অচেনা... আগন্তুক। তবে???

Friday, November 01, 2024

পরিণীতা উইথ এ টুইস্ট

প্রথমতঃ আমি তোমাকে চাই....

না: হলো না।

প্রথমতঃ বাঙালিদের এই পিছনে পানে চেয়ে থাকা কবে যে শেষ হবে কেউ কি তা বলতে পারে ?

এই কিছু বছর অন্তর অন্তর সেই এক  প্রেমের কেচ্ছা !

এবার ওয়েব সিরিজ !

শরৎ বাবু সগ্য থেকে দেখতে দেখতে স্মিত হাসি হাসছেন আর গুনগুনাচ্ছেন, "তুম মুঝে ইয়ুন ভুলা না পাওগে... এ... এ"

হত্যি কি ?

না নিয়তির পরিহাস জানিয়া কপালে করাঘাত করিতেছেন ?

("এ যে দৃশ্য দেখি অন্য... এ যে জঘন্য.. ")

"এ্যাই এ্যাই! হেইডা তো আমি এমনে লিখি নাই! তুই ক্যাডা আমার শেখরের মুখে গান গুজনেওয়ালা ?"

শরৎ বাবুর এই ২০২৪ এর শরৎ কালের নিশার নির্মল আকাশে ভিরমি খাইবার কারণ একটাই - হইচই তে ব্যতিক্রমী পরিণীতা  !!!

শেখর ও ললিতার আফটার ব্রেকআপ রেলওয়ে স্টেশনে দ্যাখা।

তার আগে শেখরের প্ল্যাটফর্মে ধুতির কোঁচা সামলাতে সামলাতে "তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা " অত্যন্ত সুরেলা গলায় গাওয়া।

হুঁ হুঁ মোটেও লাগতাসিল না ললিতার জইন্য মন হু হা করতাসে। কার লাইগ্যা গাইতাসিলে গো? 

বিষন্ন প্রেমিক রোমান্টিক গান গাইবে না করুন রসে রসগোল্লার মতন হাবু ডুবু গান গাইবে গা ? 

সো প্রথমতঃ চয়েস অফ সংগ রংগ 

স্টেশন মাস্টার হিন্দুস্থানী। তার আবার খাইয়া দাইয়া কাম নাই শেখরের পিসনে ঘুর ঘুর ঘুর ঘুর। দ্দুত!!!

আবার পাকামী করে শেখর কে জানানা ওয়েটিং রুমের তালা খুলে বসানো।

কি না বর্ষার দিনে কেউ নাকি রেল যাত্রা করবে না। ভদ্রলোক ভুলে গেছেন এখন গ্লোবালাইজেশনের যুগে লোকে সাইক্লোনেও আইসল্যান্ড যাত্রা করে।

গল্পের গরু গাছে ভালো ভাবে চড়ছে.... চড়ুক।

ট্রেন এ্যাজ ইউজুয়াল লেট। কখন আসবে জানা নেই।

শেখর স্টেশনের বাইরে তেলে ভাজা খাচ্ছে। 

স্বদেশী গান শুনছে ।

এমন সময় ললিতার প্রবেশ .... এ্যা ক কে বা রে এ্য ক কা।

তারপর আর কি ? 

বাম্প ইন্টু ইচ আদার...

তার পর অনেক গুলো ফ্ল্যাশ ব্যাক...

যার মধ্যে ললিতার স্বদেশীদের প্রতি সফ্ট কর্নার ,  গিরীন কে ইমপ্রেস করতে অতুলপ্রসাদী গাওয়া, শেখরের সঙ্গে মালা বদল ইনক্লুডেড।

দ্বিতীয়ত: আমি তোমাকে একদম চাই না । 

হু ইজ দিস ললিতা? 

আমি না , হেই প্রশ্নটা লেখক স্বয়ং জিগাইতাসে। হ্যায়ে ও নিজের হিরোইন রে চিনতে পার্তাসে না। 

কি দুঃখ! কি দুঃখ!

এগেইন দ্বিতীয়ত লেখক ইজ হিমসেলফ কনফুজিয়াছেন যে এহেন পরিণীতা তিনি কোন সালে পুঁথিগত করিয়াছিলেন

তবে অদিতি রায় নাম্নী নির্দেশিকা তুরুপের টেক্কা জোর সে টেবিলে মারলেন যখন ক্লাইম্যাক্স এ আমাগো শেখর কনফেসালো যে সে ভীতু বলিয়াই ললিতার সঙ্গে প্রেম ও গান্ধর্ব মতে বিবাহ কে পাপী সমাজের সামনে হৃদয় চীরকে বোল নেহি সেকা।

এই মারাত্মক কনফেসানের পর শরৎ বাবু সত্যিই ভিরমি খাকে মাটি মে গির কে ধড়ফড় কর কে চিল্লানে লাগা , " না ! না! এ হতে পারে না। এ হতে দেব না। আমার মেল চৌভিনিস্ট হিরো গুলার ইগো গুলাকে তছনছ কইরো না । শেখর তুমি স্লোগান ছাড় 

এ লড়াই বাঁচার লড়াই
এ লড়াই জিততে হবে... এ... এ... এ ..."

স্বর্গের সিঁড়ি ভেদ করে ব্যথায় বিধুর এক লেখকের বিদীর্ণ বক্ষ চীর করা কর্ণভেদী আর্তনাদ নির্দেশিকার কর্ণে... নো প্রবেশ করলো নি কো।

এবং এই বিদ্রোহী নোটে মানে অন দিস রেভলিউশনারী নোট পরিণীতার যবনিকা পতন ঘটিল।

তৃতীয়ত ... না: আর গেলাম না

এই রিভিউটির একমদ্বিতীয়ম পজিটিভ আসপেক্ট যে এই হৃদয় বিদারক , সো কল্ড আধুনিক ইন্টারপ্রিটেশন যুক্ত সিরিজ টি বাড়িতে বসে দুপুরে অর্ধ ঘুম ও অর্ধ জাগরিত অবস্থায় ট্যাকের পয়সা খরচ না করিয়া দেখিয়াছি। এবং ইহার জন্য আমার কোনো ক্রেডিট প্রাপ্য নহে কারণ যে নিজেকে দুঃখ দিয়ে আনন্দ পায় তার ভাগ্যে এমন যাতনা অনিবার্য।

প্লীজ এক্সকিউজ মী....




Tuesday, September 17, 2024

মিতিনের সঙ্গে এক সন্ধ্যা




মাত্র সুয্যি মামা অস্ত গেছেন। কলিং বেলের টুং টাং আওয়াজ। ভাবছি এখন কে? 

হর বিলাশ দরজা খুলছে শব্দ পেলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরে একগাল হাসি নিয়ে আমাদের মিতিনের প্রবেশ। ঘর সন্ধ্যের ছায়ায় ঝিম মেরে ছিল। এবার আলোকিত হলো। 

"আরে! কি ব্যাপার মিতিন যে।" 

মিতিন আমাদের পাড়ার মেয়ে। সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। ভারি চৌকস। যেমন পড়াশোনায় তেমনি খেলাধুলায়। আবার ক্যারাটে চ্যাম্পিয়ন ও। ব্ল্যাক বেল্ট। ওকে সেই ছোট্ট থেকে দেখছি। আমার আদরের মিতিন। এখন আবার গোয়েন্দাগিরিতে নেবেছে । মিতিন যে কিছু ভিন্নধর্মী কাজ করবে আমি আগে থেকেই জানি। তাই আশ্চর্য হইনি। ওযে এক্কেবারে অন্যধরনের মেয়ে।

এক ভাঁড় রসগোল্লা খাবার টেবিলে রাখতে রাখতে মিতিন বললে, " কেসটা সলভ হলো পিসী।"

এটা এখন একটা নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে গেছে। কোনো কেস সলভ করার পর মিতিনের মিষ্টি নিয়ে আসা। তারপর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কেস নিয়ে আলোচনা। কি ভাবে ও কেসটা সলভ করলো। কি কি করলে আরো সহজ ও কম সময়ে কেসটা সলভ হতো। এই সব। আমার চাকুরি জীবনের কিছু কিছু অভিজ্ঞতা ওঁর সঙ্গে শেয়ার করি যাতে ওঁর পরবর্তি কেসে কাজে লাগে। 

"বুঝলে পিসী, এবার ছিল এক ব্ল্যাকমেইলের কেস। সুন্দরী মেয়ের বয়স্ক ধনী স্বামী। নতুন বিয়ে হয়েছে। মাত্র কিছু মাস। তারপরেই অজ্ঞাত এক পুরুষের ভর দুপুরে মেয়েটিকে ফোন। তাঁর বিবাহের পূর্বের কেচ্ছা ফাঁস করার হুমকি। টাকা না দিলে চুপ হবে না সে। তারপর সেই মেয়ে মৃত শ্বাশুড়ির গয়না বিক্রি করে টাকা যোগায় ব্ল্যাকমেলারকে । এতে ওকে সাহায্য করে তার পূর্ব প্রেমিক। কিন্তু ব্যাপারটা কেঁচে গেলো যখন সেই প্রেমিক ব্ল্যাকমেইলারের পরিচয় পেলো। প্রেমিকাকে সে কে জানানোর আগেই প্রেমিক খুন। তারপর কেস আমার হাতে। প্রেমিকার স্বামীই আমার দ্বারস্থ হন ভীত স্ত্রীর কাছ থেকে সব জেনে।"

শুনে আমি স্তম্ভিত, "বলো কি? এযে উপন্যাসের ও বাড়া।"

"তবে? বলছি কি?" বলল মিতিন।

এরপরের বিষদ আলোচনা আর লিখছি না। 

সুচিত্রা ভটটাচার্য দেবি মিতিনের এই কেসটাকে পুঁথি গত করেছেন।

পড়ে দেখুন "পালাবার পথ নেই"।

রূপই কি মেয়েদের সব চেয়ে দামী অলঙ্কার ? 

না সুশিক্ষা?

কুকর্মের ফল কি এই জীবনেই পাওয়া যায় ?

সব হিসাব কি এই জন্মেই শোধ হয় ?

আর লিখছি না।

বাকিটা সুচিত্রা দেবির কাহিনীতে প্রকাশ্যমান ।



 

Saturday, August 24, 2024

শিকড়

এদেশীয়দের "আমরা পূর্ব বঙ্গের" বললেই মুখের ভাব বদলে যায়। হয়তো বাড়ির কাজের মাসি বা ঝুগ্গি ঝোপড়িতে থাকা কুলাঙ্গার গুলির কথা মনে পড়ে যায়। এদেশীয়দের পূর্ব বঙ্গীয়দের সম্বন্ধে এত টুকুই জ্ঞ্যান বা  পরিচিতি।

দু:খের বিষয়। কিন্তু এই নিয়ে কোনো জাতিকে অবমাননা করবো না। কারণ আমরা সবাই  কুপমণ্ডুক। নিজেদের সামাজিক গন্ডির বাইরে কত টুকুই বা জানি বা খোঁজ রাখি ? 

বলাই বাহুল্য বেশি কিছু বলেও লাভ নেই। বললেও কি বলব? আমাদের সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের পাশে বিরাট বসত বাড়ি ছিল? শান্ত পুকুর ঘিরে অনেক খানি জমির উপর বাগান -  ছায়া ভরা গাছগুলির  প্রতিচ্ছবি পুকুরের জলে স্থির হয়ে থাকতো? আর সেই যে বাগানের গেটের উপর কামিনী ফুলের চাঁদোয়া? ফুল ঝরে পড়ত গেটের বাইরে রোয়াকে। 

কত লোক যাতায়াতের পথে সেই রোয়াকে বসে জিরিয়ে নিত। তাঁদেরই মতন আর এসে বসত একটি মেয়ে। সদ্য বিবাহিতা। স্বামী ও শ্বাশুড়ির হাতে নির্যাতিতা। প্রায়ই দ্যাখা যেতো তাঁকে এলো চুলে মন্দিরের পিছনে নদী পারের ঘাটলায় উদাস নেত্রে বসে থাকতে। তখনও সে বিশ্ববন্দনীয়া হননি। 

একদিন তিনি এসে বসেছেন আমাদের বাড়ির  রোয়াকে। দাদু বাগানে পায়চারি করতে করতে লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পড়া অল্পবয়সী মেয়েটিকে দেখে বললেন, "বাইরে কেন মা? ভিতরে এসে বসো।" মেয়েটি মাথা নোয়ালেন। না তিনি ভিতরে আসবেন না। ততক্ষণে দিদিমা বাইরে এসে পড়েছেন। বললেন , " লজ্জা কিসের মা? তুমি তো আমার মেয়ের মতন।" মেয়েটি নত শীরে উত্তর দিলেন, " মা, আমি ঘরে পা দেব না। তবে আপনি আমায় মেয়ে বলে ডেকেছেন, আজ থেকে আপনাদের মা আর  বাবা বলেই জানবো।" 

সেদিন থেকে ওই পাতানো কন্যাটির সঙ্গে এ বাড়ির রক্তের চেয়েও প্রগাঢ় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমার এক মাসির সঙ্গে ছিল তার সহদরার মতন ভাব। 

এরপর অনেক বছর কেটে গেছে । সাধনার অনেক উচ্চ স্থানে পৌঁছে ও রাজনৈতিক পরিপৃষ্ঠতা পেয়েও তিনি বৈরাগীই রয়ে গেছিলেন। দিল্লীতে শতেক শিষ্য গণ দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে কখনো এসেছেন। আমার মা ছুটে গেছেন তাঁকে দেখতে। হাজার খানেক লোকের লাইন অবজ্ঞা করে শুধু মাত্র বলে পাঠিয়েছেন : " রাজশাহী থেকে রাজমোহন বাবুর ছোট মেয়ে এসেছেন দ্যাখা করতে।" অমনি ডাক পড়েছে । 

শিশু সুলভ আনন্দে ভরে উঠেছেন। পরিবারের প্রত্যেকের নাম নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খবরাখবর নিয়েছেন। মার হাতে তুলে দিয়েছেন আশির্বাদ স্বরূপ কখনো কিছু কখনো কিছু।

খুব ইচ্ছে ছিল সেই মন্দির দ্যাখার। সেই পুকুর পাড়। সেই বসত বাড়ি। সেই কামিনী গাছের ছায়ায় মোড়া রোয়াক খানি। হয়তো বিধ্বংসী বন্থিশিখা জ্বলার আগেই ছারখার হয়ে গেছে সেই সব স্মৃতিচিহ্নগুলি ।

হয়তো সেই বাড়ি আর নেই। নেই সেই পুকুর। কামিনী গাছের ছায়া ঘেরা রোয়াক । কিন্তু মন্দির?  মন্দির তো ছিল নাম করা। অনেক ভক্তগণের আরাধ্যা দেবীর ঝলমলে আসন। 

ভগবান কে কি হত্যা করা যায় ?  

জ্বালিয়ে নাশ করা যায় ? 

ইতিহাসের মতন মুছে ফেলা যায় ? 

নতুন ইতিহাস গড়ার আগে কি সেই অবিনশ্বরকে একবার ডাক দেবে না সময়?

" হে পরমেশ্বর চেয়ে দ্যাখো তোমার স্মৃতি সৌধ মুছে ফেলে নতুন ধর্মের আবাহন করছি আমরা অমৃতস্য পুত্রা:।"

"আশির্বাদ কর আমরা যাতে সফলকাম হই!"





Tuesday, July 23, 2024

হঠাৎ ..... কাল্পনিক!!



গতকাল সন্ধ্যাবেলায় সুচিত্রা ভট্টাচার্যের একটি উপন্যাস পড়তে পড়তে তন্দ্রা মতন এসে গেছিল। 

হঠাৎ মোবাইলটা বেজে ওঠাতে জেগে গেলাম। 

অচেনা নম্বর। 

কলটা রিফ্লেক্স একশনের মতন রিসিভ করতেই অপর প্রান্তে এক আগন্তুকের স্বর। প্রথমে বুঝতে পারিনি। কথাগুলো জড়ানো জড়ানো। আমি প্রশ্নসূচক উত্তর দেওয়াতে সেই অজানা ব্যক্তি এবার স্পষ্ট ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলো :

"আর ইউ ইন ইন্টেলিজেন্স বিউরো?"

ভদ্রলোকের কথায় বেশ টান আছে। হয় বাঙালি নয় মাদ্রাজী। মাদ্রাজী মানে তেলুগু, তামিল, কন্নড়, মালিয়ালী  - যা কিছু।

আমি না করাতে অপর প্রান্তের ফোনকারী জোর দিয়ে বলল: 

"আই অ্যাম কনফার্মড দ্যাট ইউ ওয়র্ক ফর ইন্টেলিজেন্স বিউরো।"

আমিও ততোধিক জোর দিয়ে বললাম:

"ওয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট?"

জোরটা হয়তো বেশি হয়ে গেছিল। 

আমার প্রশ্নের উত্তরে টক করে লাইনটা কেটে গেলো।

বুকটা ছাৎ করে উঠলো। 

এই অপরিচিত লোকটা কেমন করে জানলো আমার গুপ্ত ইচ্ছার কথা ? 

আমি যে এককালে সী বী আই, সতর্কতা বিভাগ বা এমনি কোনো একটি অনুসন্ধানমূলক দপ্তরে কাজ করতে উদগ্রীব ছিলাম ?

আর স্পাই হওয়া মানে তো একটা দারুন রোমহর্ষক ব্যাপার - নয় কি?

কিন্তু সেই চাকুরিটি হতে হতে হলোনা। 

যিনি আমাকে অফার করেছিলেন তাঁকে অতীব উৎসাহের সঙ্গে উত্তরে বলেছিলাম, "হ্যাঁ স্যার, একবার সুযোগ দিন । সব কটাকে দেখে নেবো।"

ভদ্রলোক মৃদু হেঁসেছিলেন মাত্র। 

তারপর থোর বড়ি খাঁড়া আর খাঁড়া বড়ি থোর। 

যে তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে গেলাম।

ফোনটা বন্ধ করে অনেক ভাবলাম।

কে এই ভদ্রলোক যার আমার ইন্টেলিজেন্স বিউরোতে কাজ করা নিয়ে এত চিন্তা?

আমাকে না হয় ভুল করে ফোন করেছিল কিন্তু সত্যি যার চাকুরি নিয়ে এত দুশ্চিন্তা সে কে?

আর কেনই বা এত দুশ্চিন্তা ?

এই একটি কিছুক্ষণের ফোনচারিতায় আমার হৃদয়ের শুপ্ত বাসনাগুলো আবার  পট পট করে জেগে উঠল।

ভদ্রলোক কোথায় আঘাত করেছেন জানেন কি?

আবার ফোন।

এবার চেনা কন্ঠ স্বর।

আমার স্কুলের বান্ধবী।

ওকে কিছুক্ষণ আগের ফোনের কথাটা বলাতেই কিছু সাবধান বাণী কর্ণপটে গলগল করে পড়ল :

"আজকাল বহুত ফ্রড কল হচ্ছে। তুই জানিস?"

কিছু দুর্ঘটনার বিবরণ....

তারপর

"কোনো আননোন নাম্বার তুলবিই না।" 

গেলো।

দ্বিতীয়বার কাল্পনিক বা কিয়ৎক্ষণের জন্যই হোক আমার জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয়, সবচেয়ে লোভনীয় চাকুরিটা ফেল্টু মেরে গেলো।

অনেকদিন পর বুড়ো বয়সে হাত পা ছুঁড়ে ভেউ ভেউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করলো।

দূরে কোথাও এফএমে বেজে উঠল :

"পাগলা ...আ...আ ...মনটারে তুই বাঁধ... ধ....ধ...., কেন রে তুই ...ই ...ই ... যেথা সেথা পড়িস প্রাণের ফাঁদ ...দ ...দ ...দ "

খুউব দরদে গলা।

পারলাম না।

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ডুকরে ডুকরে কেঁদে ফেললাম।

এখন মনটা হালকা লাগছে।

ভাবছি ভদ্রলোককে পাল্টা ফোন করি ।

"ইয়েস আই ওয়ার্ক ইন ইন্টেলিজেন্স বিউরো। ওয়াট ইজ ইওর প্রবলেম ? মে আই নো?"

আমার কল লগে ওই নাম্বারটা এখনো আছে।

ডিলিট করিনি।

একবার ট্রাই করবো নাকি?

কি বলেন?


Saturday, October 06, 2012

দ্রাক্ষা ফল টক!


জীবনে বিফলতার আলাদাই দাম আছে। কেউ মানুক ছাই না মানুক, আমি মানি, আমি জানি, এবং এই গুহ্য অনুভূতির খবর সেই রাখে যে জীবনে নিষ্ফলতার স্বাদ ভোগ করেছে। কথাটা ক্লীশেড (clichéd) অর্থাৎ বহু সংখ্যক বার নানা ভাবে বহু প্রাজ্ঞ ব্যাক্তির মুখে শোনা, বহু বিধ মঞ্চ আলোড়িত করে চর্চিত, বহু আড্ডায় তুফান তুলে আলোচিত ও গর্বিত স্বরে ঘোষিত - তাই নয় কি?

তবু ‘আমি বিফল’ এই কথাটা কেউ মুখ ফুটে বলতে চায় না। বিফলতা লজ্জাদায়ক, প্রেরণাদায়ক নয়। কিন্তু আশ্চর্যের ঘটনা এই যে অনেক নামচিন ব্যক্তি নিষ্ফলতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই সফলতার মুখ দেখেছেন। মজার ব্যাপার এই  যে , সফল ব্যাক্তি গর্বের সঙ্গে বলতে পারেন ‘আজ আমি সফল কিন্তু এক কালে এই আমি বিফলতার দহনে দগ্ধ ছিলাম’কিন্তু যে হামেশাই অসফল, তার অসফলতা তার জীবনের মাপকাঠি  হ’য়ে দাঁড়ায়। ‘ও লোকটা জীবনে কিছু করতে পারলে না’, শ্লেষোক্তি; ‘উনি কি ছিলেন আর এখন কোথায় পৌঁছেছেন,’ সম্মানোপযোগী বইকি!

বিফল মানেই পুরুষার্থের অভাব; সফল মানেই অসাধারণ কর্মঠ । সব সময়ই কি তাই? ‘লাক ফেক্টার’ ইংরাজীতে একটা কথা আছে – ভাগ্য সদয় – সব   ব্যাঞ্জনে নুনের মতন অপরিহার্য। এ যুগের যুবক-যুবতী বর্গ একথা মানতে অনিচ্ছুক (তাঁরা ভাগ্যকে নিজের হাতে গড়ে নিতে চায়)। বেশ কথা। বয়স কালে আমি ও মানতাম না । এখন মানি? হয়ত মানি । মেলোড বাই এজ – অর্থাৎ বিগতযৌবনার অনুশোচনৌক্তি। হতে পারে। তবে অনেক সময় দেখেছি পরিশ্রম কাজে দেয়নি, যা চেয়েছি তা পাইনি – উদ্যমের অভাবে নয় নিজেকে ঠীক সেরকম ভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরতে পারিনি তাই। যাকে ইংরাজিতে বলে ‘হাইপ’, মেনেজমেন্টের বুলিতে বলে ‘এক্সপোজার’কর্পোরেট জগতে কর্মীর মেরিট, শ্রম ও অধ্যবসায়ই শেষ কথা নয়। চাকুরীক্ষেত্রে আমি একটি মার্কেটেবল কমোডিটি  আমার মার্কেট ভ্যালু আমার সেলেবিলিটির উপর নিরভর্শীল মোদ্দা কথা হ’ল আমি নিজেকে সেল করতে পারিনি। গোঁড়ায় গলদ। চাকুরী জীবনের শুরুতেই সুমনের সেই বিখ্যাত গানটা শুনে ফেলেছিলাম – ‘ যদি ভাব কিনছ আমায় ভুল ভেবেছ’। এবং তাদ্দ্বারা ভীষণ ভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম ।

সে কথা বাদ দিলাম না হয় ।

তাহলে সফলতার পরিমাপ কী ? মাথার ঘাম পায়ে ঠেলে কাজ করে যাওয়া চুপিসারে ? নাঃ, সেটা আমার মতন চিনির বলদের একপেশে ট্রেডমার্ক । এই প্রোফেশনাল তাড়িত যুগে সফলতার চাবিকাঠি একটাই -  কিছুটা কাজ (দেখানো!), কিছুটা প্রোফিশিয়েন্সি আর অনেক খানি এগজিবিশনিজম্। মানে এক আনা কর্ম  নিপুণতা বা দক্ষতা আর ষোলো আনা আড়ম্বর। এই ফর্মুলা/মন্তব্য বিতর্কের ঝড় তুলবে। তুলুক।

আজকালকার ৮০% প্রোফেশনালদের আমি এইরুপ  মনোভাব পোষণ ও উক্তি জ্ঞ্যাপন করতে শুনেছি। সার মর্ম এই যে আমি এরকম প্রোফেশনাল নই, ছিলাম না, হতে পারব না, হওয়ার ইচ্ছা রাখিনা। আমি বিফলকামই সই।

‘কি পাইনি, তার হিসাব মেলাতে মন মোর নহে রাজি’। 

বিফলতা আমায় মজবুত করুক। সুখের চেয়ে শান্তি ভালো। শান্তির চেয়ে ও সোয়াস্তি আর সন্তুষ্টি ভালো। আর তার চেয়ে ও ভালো নিজেকে সব সময়  প্রুভ করার স্ট্রেস থেকে মুক্ত থাকাএটা যদি  ইনকম্পিটেন্ট ও যোগ্যতাহীনের দার্শনিকতা বলে মনে হ’য় – তবে তাই।

---

রাত একটা নাগাদ ব্লগটি লিখে কী খেয়ালে ফেস বুকে ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে সবুজ, আমার সাথী-ব্লগারকে অন-লাইন পেলাম। দেড়টা অবধি চ্যাট করে শুতে গিয়ে মনে হল ব্লগটা সততই নিরপেক্ষ হয়নি। সত্যিই কী পরিস্থিতি বিফলতার জন্য দায়ী ? কোথাও কী ডিটার্মিনেশনের অভাব ঘটেনি? কখনো কী শ্রমে মাঝ পথে বিরাম টেনে হাল ছেড়ে দিইনি? তাড়াতাড়ি পরাজয় স্বীকার করে নেওয়ার মধ্যেও কী পলায়নবাদী মনোভাব দৄষ্ট নয় ? সব প্রশ্নের উত্তর শৎ-প্রতিশৎ  হ্যাঁ না হলে ও আবার একশো ভাগ না ও নয়।

জীবনটা হ্যাঁ-নার পাঁচমিশালী ডাল। ফোঁড়নের অভাবে ফিকে হয়ে গেছে। এক-কালে ভালো রাঁধুনি বলে খ্যাতি ছিল। আজকাল মশলার প্রোপর্শন গুলিয়ে যায়। তাই ফলাহার করেই দিন ব্যয় হয়। রসদের অভাব তাই ভালোমন্দ খাওয়া জোটে না । আর সে জন্যই হয়তো দ্রাক্ষা ফল টক!!    

রান্নায় যেমন ফোঁড়ন আর মশলার মাপ-ঝোঁক খাদ্দ্যের স্বাদ কমায় বাড়ায়, তেমনি জীবনের স্বাদ ও (সফলতা- বিফলতার) আমাদের নিজস্ব ফোঁড়নের আর মাল-মশলার আঁকিঝুকির উপর নির্ভরশীল। কোথাও মশলার অভাব ঘটেছে কিম্বা কোথাও হয়েছে আধিক্য। যেমন পিছনে হটে যাওয়া দেয় পরাজয়ের গ্লানি তেমনি এগিয়ে না আসাও দিয়েছে আরো পিছনে ঠেলে। কোনটা ঠীক বলা মুশকিল – পিছনে হটে যাওয়া না এগিয়ে না আসা। ভেবে দেখতে হবে। সঠীক মুল্যায়ণ বিচার সাপেক্ষ। তবে এটা ঠীক হিসেব শেষ-মেষ হরেদরে সমান। তাই আবার বলি – “জীবন খাতার প্রতি পাতায় যত কর হিসাব- নিকাশ কিছুই রবে না ”।  

আসি...        

Saturday, September 15, 2012

কিছু সত্যি কিছু গল্প


বাড়ীটা চোখে দেখিনি । কিন্তু মনের কোণে একটা ছবি আঁকা আছে - বাগান ঘেরা, বিশাল।  বাঁধানো দালান, বড়-বড় ঘর, বিরাট-বিরাট জানালা আর দরজা, উঁচূ ছাদ লম্বা, টানা দেয়াল ঘেরা। জানালার কপাটগুলোয় রঙ-বেরঙের কাঁচ বসানো যার মধ্যে দিয়ে সোনা রোদের ঝিলিক খেলা করে ঘরের মেঝেতে। মা বলেন বাগানে একটা বড় পুকুর ছিল - বাঁধানো ঘাট, ছায়া ঘেরা। স্বচ্ছ স্ফটিকের  মতন জল। জলে বাগানের সবুজ মিলেমিশে একাকার।


বাগান পেরিয়ে পথ চলে যায় এঁকেবেঁকে প্রবেশ দ্বারের দিকে যাকে আজকাল কার আধুনিক ভাষায় বলে গেট। গেটের বাইরেই রোয়াক। বৈকালে ছেলেদের আড্ডা জমে সেখানে আর গুরুজনেরা বসে তামাক টানেন গুড়-গুড় করে মধ্যাহ্নে। গেটের পাশেই একটা কামিনী গাছ ফুলের ভারে ঝুঁকে পড়েছে রোয়াকের উপর। শ্রান্ত পথিকেরা প্রায়ঃ ই এসে বসত রোয়াকে। কিছুক্ষণ জিরিয়ে আবার পথ চলার উদ্দ্যম ফিরে পেত।


আর এসে বসত সেই মেয়েটি – এক পীঠ এলো চুল, কপালে সিঁদুরের টক্ টকে টিপ, লাল পাড় সাদা সারি। ভারী মায়া জাগানো মুখের শ্রী কিন্তু চোখ দুটি বড়ই উদাসীন।  বাড়ীর পাশেই সিদ্ধেশ্বরী দেবীর মন্দির। মন্দিরের পিছনে নদী বয়ে যায় কুল কুল করে - কী নাম জানি। কতদিন সেই মেয়ে মন্দিরের ঘাটলায় বসে থাকে বিষণ্ণ মনে। নদীর শান্ত প্রবাহে কী যেন  খোঁজে। নতুবা চেয়ে থাকে উদাস চোখে দূর দিগন্ত পাণে যেখানে আকাশ মেশে পৃথিবীর বুকে। সংসারে তাঁর মন বসে না। শ্বাশুড়ীর গঞ্জনা,  প্রতিবেশীদের টিটকারী, আত্মীয় স্বজনের খিটিমিটি সবই সে অগ্রাহ্য করে, কিছুই তাঁর গায়ে লাগে না।


একদিন ভর দুপুরে বাড়ী ফেরার পথে ছায়া-স্নিগ্ধ রোয়াকে এসে বসে সেই মেয়েটি। বাড়ীর কর্তা তখন বাগানেই পায়চারী করছিলেন। অবেলায় ক্লান্ত মেয়েটিকে বাইরে বসে থাকতে দেখে সস্নেহে ডেকে বলেন, “বাইরে কেন মা? ভিতরে এসে ব’স”।  মেয়েটি উত্তর দেয়, “আপনি যখন মা বলে ডেকেছেন, তখন আমি আপনাকে বাবা বলেই সম্বধোন করি”। কর্তা বলেন, “ বেশ তবে তাই হোক। আজ থেকে তুমি আমার আরেক মেয়ে হ’লে। তবে আর বাইরে কেন ভিতরে এস”। মেয়ে বলে, “না বাবা! আমি ভিতরে আসব না। এখানেই বেশ আছি”।


সেই থেকে শুরু এক অভিনব সম্পর্কের। বাড়ীর কর্তা হলেন বাবা আর গিন্নী হলেন মা। তবে মেয়েটিকে কিছুতেই ঘরের ভিতরে আনতে পারেননি কর্তা। শুধু কামিনী গাছটি বাবা-মেয়ের এই অদ্ভুত সম্পর্কের টানকে প্রত্যক্ষ করেছে নীরবে।


শহর ঢাকা। ইংরাজী সন ১৯৪৭ সালের ও কিছু বৎসর আগের কথা।


তারপর কেটে গেছে কত বছর। সেই মেয়েটির হয়েছে জগত জোড়া নামডাক। সবাই মা বলতে অজ্ঞ্যান।কত সেবক-শিষ্য-অনুচর বৃন্দ তাঁর – ডাকসাইটে নেতা, গণ্যমান্য ব্যক্তিগন, সমাজের প্রতিনিধি যাঁরা। কিন্তু এত খ্যাতি-মান সত্ত্বেও ভোলেনি সে সেই ঢাকার দিনগুলি। “মা ঢাকার অমুক বাড়ীর মেয়ে এসেছেন দেখা করতে” বলার সঙ্গে-সঙ্গে তাঁর খাস অনুচর এসে মায়ের ঘরে  সোজা নিয়ে গিয়েছে অপেক্ষমানাকে। বাইরে এক মুহূর্তও সহস্র দর্শনার্থীদের ভীড়ে লাইন দিয়ে দাঁড়াতে হয়নি।


এসব এখন গল্প মনে হয়। তবে মাঝে-মাঝে বড় ইচ্ছে করে সেই শহর, সেই পল্লী, সেই পথ যদি ফিরে পাওয়া যেত। ছুটে চলে যেতাম ...কিন্তু কোথায়?


আছে কী সেই ঢাকা শহর, সেই বাগান-ঘেরা বাড়ী, সিদ্ধেশ্বরী দেবীর সেই মন্দির আর সেই ফুলের ভারে নুয়ে পড়া কামিনী গাছ?


তবুও কেন জানিনা...


সত্যিই ভিটের টান বড়ই সাংঘাতিক!!