Wednesday, June 13, 2012

শৈশব - ১


আমি যখন ছোট ছিলাম সারাদিন স্বপ্নের রাজ্যে বিচরণ করতে ভালবাসতাম । আমাদের বাড়ির সামনে ছিল মস্ত বড় একটা পার্ক ।  ছাদের ঘরের জানালায় উঁকি মারত বিরাট একটা নিম গাছের ডাল । তার কচি, সবুজ পাতাগুলো হাওয়ায় দুলে দুলে হাতছানি দিত আমায়। দিনের বেলায় সূর্যের আলোর ঝিকিমিকি পাতার সবুজের উপর যখন খেলা করত তখন সুবর্ণ বনানীর শোভা মন ও চোখ দুই কেড়ে নিত। সেই খেলা দেখতে দেখতে কত যে ঘণ্টা কেটে যেত তা আর বলার নয় ।বলা বাহুল্য পড়াশোনা  খুব একটা বেশী হত না এবং তাতে মন ও ছিল না বিশেষ ।

এখন জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে চোখে পড়ে আকাশ ঢাকা কংক্রিটের বিল্ডিং । সামনেই এম সি ডির ছোট একটা পার্ক যেটা অযত্নে জংগলে পরিণত হয়েছে । সরকারি মালীগুলো বড়ই বেয়াড়া – শত ডাকলেও আসে না । তাই পরিষ্কারের পাট অনেক আগেই উঠে গেছে । ফলে কিছু আবাসী পার্কটাকে ময়লা ফেলার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে ।

এই ফ্ল্যাটে আসার পর শখ করে পার্কে একটা নিম গাছের চারা পুঁতে দেওয়া হয়েছিল । তখন পার্কটা পার্কই ছিল – বনে পরিণত হয়নি । সেই চারা আপন উৎসাহেই বেড়ে উঠে বিশাল ছায়া ঘেরা বৃক্ষ হয়ে আকাশের সাথে নীরবে কথোপকথন করত । কিছু মাস হল গাছটা দেখি ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে ।

চড়ুই পাখী আজকাল খুব একটা নজর পড়ে না। দু একটা গাছ ফ্ল্যাটের সামনে পুঁতেছিলাম – পাতাবাহার, ক্রোটন, মানি প্ল্যান্ট, চাঁপা। এবার গরমে দেখি প্রায়ঃ অনেক গাছই ঝলসে পুরে যাচ্ছে।

সেই সোনালীর খেলা, আকাশের মেলা, হাওয়ার দোলা, মন ভোলানো সবুজের ছোঁয়া আর কী কখন ফিরে পাওয়া যাবে ?

তাই ভাবি...        



Friday, June 08, 2012

বালগোপাল

জানালার খড়খডি  দিয়ে সরু রোদের এক ফালি মশারীর গায়ে লেপটে পডার  সাথেসাথেই ঘুমটা ভেঙ্গে গেল । এখানে ভোরের  হাওয়ায়  পাখীর   গান  ভেসে আসে না । গাছই  নেই  তো পাখীর কলরব ! ভোরের শব্দের চেনা সুর একটাই । পূজার  ঘর  থেকে টুং টাং  ঠুং  ঠাং  আওয়াজ   । পিসীর  দিনচর্জা  শুরু । কম করে একটি ঘন্টা ঠাকুরের সেবা যত্ন চলবে । রাতে তাঁদের  শয়ান  দেওয়া হয়েছিল  - এখন  তাঁদের  ওঠানো, চান  করানো , পূজো  দেওয়া , মন্ত্র  পড়া  আর সব শেষে মনে করিয়ে দেওয়া ঠাকুর  আমরাও  আছি একটু দেখো - এই আর কী  । ঠাকুর  দেবতারা যদি এমনি ভাবে ঘুমুতে জান  তাহলে ভক্তদের যে কী  অবস্থা হয়  তা খবরের  কাগজ  পড়লেই  টের  পাওয়া যায়  ।


পিসেমশাই মাঝে মধ্যেই ঠোনা  দিয়ে বলেন ," হু:! ভগবানের আবার এত ঘুম কীসের ?" পিসী  মুখ ঝামটা দিয়ে উত্তর দেন , " দেখো, তুমি আমার পেছনে বেশী লাগতে এস না বোলে  দিলাম" । আমি মুখ  টিপে  হাঁসি আর মজা দেখি ।


পিসীর  যতক্ষণ  পূজো  পর্ব  চলে ততক্ষণ আমার কাজ হলো উঠে চায়ের জল বসানো আর চায়ের সরঞ্জাম গুছিয়ে রাখা । পূজো  পর্বর পর চলে চা পর্ব । এ বাড়ীতে  পর্বের আর শেষ নেই ।পুজো শেষে চায়ের ট্রে  হাথে করে আমার প্রবেশ । পুজোর ঘরের একপাশেই খাবার বড়  টেবিল (ভাড়া বাড়ি তাই জায়গা কম- তবে নিজের  বাড়িতে, যেটা এখন    নির্মাণাধীন , পূজোর  আলাদা ঘর  চাই , পিসী  বলে দিয়েছেন  । আর পিসীর  কথা না শোনা পিসেমশাইয়ের পক্ষে অসম্ভব )। চায়ের ট্রে  রাখতেই পিসী  এসে খাবার টেবিলে বসে পা দোলাবেন কিছুক্ষণ । তারপর চায়ের পটে চায়ের পাতা আর আন্দাজ  মতন  জল  ঢেলে কিছুক্ষণ পুরোনো  দিনের গান গুনগুন করে গাইবেন । চাও বাপু যেসে  নয়  - শ্যামবাজারের  অরফ্যান এর (দোকানের পুরো নামটা আর মনে নেই ) একশো  কুড়ি টাকা কিলো চা - আমি কুড়ি বছর  আগেকার  কথা  বলছি , এখন নিশ্চই  দাম আরও  বেড়ে গেছে । সেই চা বানানোর  কায়দাই  নাকি আলাদা । পিসীর  সময়  গোনা আছে । তিন  মিনিট  কিছু সেকেন্ড  পরে সোনালি  পানীয়  টি পট থেকে   তিনটে  কাপে ঢালা হবে । তারপর  পরিমাণ  মতন দুধ ও চিনি থুড়ি চিনি তো চায়ের কাপে আগেই ঢালা হয়ে গেছে । এ বাড়িতে চায়ের কাপ প্লেটের ওপর খরচ সব চেয়ে বেশী  - নানা বিধ আকার , রং ও কারুকার্য করা কাপ প্লেট কাঁচের আলমারিতে সাজানো পাবে । চায়ের পরিমাণ , রং, স্বাদ, গুন ইত্যাদি কিছুতে  যদি কোনক্রমে একটু এধার ওধার  হ ল  কি মেজাজের সঙ্গে দিনও  খারাপ  যায় ।


পিসীর  একরাশ ঠাকুর দেবতার মধ্যে সব  চেয়ে প্রিয় একটি পিতলের ছোট হামাগুড়ি দেওয়া বালগোপাল । পিসী  নি:সন্তান । তাই  বোধহয়  বাচ্চা কেষ্ট  ঠাকুরের মুর্তিতেই  নিজের  না পাওয়া সন্তানকে খুঁজে বেড়ান । বালগোপালকে  রোজ শোয়ানো , বসানো, খাওয়ানো-দাওয়ানো , ঘুম পাড়ানো আর ঘুম থেকে জাগানো এই নিয়েই পিসীর  দিনের অনেক খানি সময় কেটে যায় । মাঝে পিসির   পিসেমশাইয়ের সঙ্গে একপ্রস্থ কথা কাটাকাটি হয়ে গেছে -  বালগোপালের  এক খানা সোনার  মুকুট  কিনে দিতেই হবে। পিসেমশাই  গররাজি ছিলেন, পিসী  নাছোড় বান্দা । শেষ পর্যন্ত  স্যাঁকরা  ডেকে  অর্ডার  দেওয়া হয়েছে - কিছু দিনের  মধ্যেই  মুকুট এসে পড়ল বলে ।







চায়ের কেতলিটা গ্যাসে বসানোর সঙ্গে সঙ্গে ঠুক  ঠুক  করে পেছনের দরজায় ঘা ।  । রান্নাঘরের দুটো  দরজা  - পিছনের  আর  সামনের  । সামনের দরজা  দিয়ে হল  ঘর , খাবার  ঘর অর্থাৎ বাড়ির ভিতর এবং বাড়ির লোকেদের  যাতায়াতের  পথ  । পিছনের দরজাটা এক ফালি সরু গলিতে গিয়ে পড়ে । গলি দিয়ে সোজা গেলেই পিছনের দরজা । বাড়ির ঝি , জমাদার , মাছওয়ালা , মালি , সবজিওয়ালা, ইত্যাদির এই পথে আবাগমন । পিসীর পূজোর  ঘরের  জানালাটাও  এই গলিতেই খোলে । এখন  যদিও বন্ধ   । পূজোর  সময়  পিছনের দরজায়  কারোর  আসা পিসী  খুব একটা পছন্দ  করেন না । বিশেষ করে জমাদার । " মরার  দল  ভালো ভাবে পূজোটাও  সারতে  দেবে না " - পিসীর  চিল  চিত্কারে ঠাকুর দেবতার দল এমনিই  ঘুম থেকে ধড়ফ  ড়  করে উঠে পড়ল বলে।


পা টিপে টিপে গিয়ে দরজা খুলে দেখি যা ভেবেছি তাই - একগাল  হলুদ  দেতো  হাঁসি , হাতে ঝাড়ু , ঘর্মাক্ত কলেবর , চুলগুলো  উসকো  খুসকো , গায়ের বেনিয়ানটা জায়গায়  জায়গায় ছেঁড়া আর ধুতিটা ডবল করে হাঁটুর উপর ভাজ করে কোমরে গোজা , পায়ে চটি নেই  । রোজকার ছবি তবুও রোজ দেখে নতুন মনে হয় । আর রোজই  ভাবি পিসিকে  বলব ওকে এক জোড়া নতুন বেনিয়ান আর ধুতি আর পিসেমশাইয়ের পুরনো একটা চটি দেবার কথা । আর রোজই ভুলে যাই ।খুব ই তুচ্ছ   ব্যাপার কিনা তাই ভোলাটাও অবশ্যম্ভাবী ।


এদিকে কল খুলে জল নিয়ে ঝপাক  ঝপাক  করে ঝাড়ু  মারতে শুরু করেছে লোকটা ।নোংরার থলেটা আগেই তুলে নিয়েছে । ও র  ঝাড়ু , বালতি সব আলাদা - পিছনের গলিতেই রাখা থাকে, কেউ  সেগুলোতে হাত দেয় না  ।ও র কাজের অবধি  মিনিট দশেকের ব্যাপার কিন্তু এই মিনিট দশেকই  ভারী পড়ে  যেদিন ও না আসে ।"বাড়িটাকে অপবিত্র করে ছাড়লে " পিসীর  দোষারোপের শেষ   থাকে না ।


জল ভালো ভাবে  কাঁচিয়ে এক গাল হেঁসে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে , " দিদি হয়ে গেছে "। ঘাড়  কাত  করে হাঁসতে হাঁসতে ই  বলে , "আসি তাহলে"। ওর হাঁসিটা বড়  সরল , ছোটো  শিশুর মতন ।  অশিক্ষিত   তবুও ভারী ভদ্র . অমায়িক । আমি বলি ," এস "। দরজার কাছে পৌঁছতে  পৌঁছতে  হঠাত খেয়াল হয় লোকটা রোজ আসে তবুও কখনো ওর নামটা জিজ্ঞাসা করা হয়নি । ডেকে  উঠি "ও ভাই শোনো  । তোমার নামটা জানি কী  ?"


ফিরে দাঁড়িয়ে আবার সেই সরল হাঁসির ছোঁয়া আনে ঠোটের  কোনে । লাজুক ভাবে বলে " আমার নাম ? দিদি , আমার নাম ? বাল  গোপাল । আপনে দিদি আমায় গোপাল বইলা  ডাইকবেন "। আমার মুখে কথা সরে  না । মাথা নেড়ে  সায় দিই  । 


দরজা দিয়ে ফিরে আসতে আসতে গ্যাসের উপর গরম জলের কেতলির হুশ হুশ শব্দ পাই ।পূজোর  ঘরের দরজা খোলার আওয়াজ। পিসির গলা - চেঁচিয়ে বলেন  "কেরে  মিঠু কে ওখানে "? আমি  বলি  , " কেউ না " । মনে মনে  বলি কর্ম   ব্যস্ত , ঘর্মাক্ত , মলিন , জীর্ণ  বস্ত্রে আবৃত গোপাল - তোমার বাড়ি রোজ আসে  যাকে  দ্যুত্কারে , অবহেলায় আমরা রোজ দূরে  সরিয়ে দিই । 


কেতলির মুখ দিয়ে ধোঁয়া বেরোয়  ।  গ্যাস বন্ধ করে দিই । এখন চা পর্বর শুরু । রোজকার কাজে মন দিই ।



Thursday, June 07, 2012

অনেক দিন পর

আজ  অনেক দিন পর ব্লগে এসে দেখি সব  ওলট পালট হয়ে গেছে । লাইনের  এলাইনমেন্ট  বিগড়ে গেছে । রঙ  পাল্টে গেছে - লালের জায়গায় মেরুন ।এরা আমার ব্লগ নিয়ে করছেটা কী ? তবে এখন টাইপ  করার সুবিধে হয়েছে মনে হয় । ভালো হলেই ভালো।

 

খুব গরম পড়েছে । চল্লিশের ওপরে টেম্পারেচার যাচ্ছে । এদিকে বাডিতে  প্রচুর রিপেয়ারের কাজ দরকার । কি করে যে কী  হবে বুঝে উঠতে পারছি না । আবার শরীর ও সহায় নয় - ভার্টিগো । বেশ কিছু দিন  হলো ভুগছি । ছুটি নেই । অথচ  বাডিতে কাজ  করাতে হলে  ছুটি চাই । এখন  শুধু ভগবান  সহায় । 

Wednesday, May 16, 2012

সিন্দুরী

সন্ধ্যাকাশে রক্তাক্ত  সুর্যের   টিকার  মতন । সজল   দিঘির  কপলে  রবির   পরশ  যেমন । মনে  আছে ছোটবেলায়  মা কে দেখতাম  রাঙ্গা কপালে সিন্দুরের   টিপ  আঁকতে । সেই  টিপ  অপরূপ  মুখচ্ছবিতে জ্বলজ্বল  করত   অগ্নিশিখা  সম ।  হঠাত   কেন   জানিনা  মনে  পডে গেল  রোদে  ঝলসানো  গ্রীষ্মের  সোনালী  দুপুরগুলোর  কথা  ।   অথবা  বোধ করি  মার  রান্নার  হাথে  হলুদের  সেই  ছোপ ।  বা   পুষ্পদির   সেই  শীল  নোডায়   লাল   লংকা   বাঁটা ।  এত গুলো কথা মনে পডে   গেল  ফল ওয়ালার  ঝাঁকি দেখে ।  ফোকলা  দাঁতে  হেসে  বলল , " দিদি  লে  যাও  বহুত  মীঠা   হ্যায় " । আমিও  লোভ   সামলাতে  না পেরে কিনে ফেললাম  এক  কিলো । সত্যি  খেতে বড়ই সুস্বাদু । টকমিষ্টি স্বাদের  বাহার   জীভের   ডগায়  লেগে থাকে খাওয়ার অনেক  ক্ষণ  পরেও। দিদি বলে, "পারিনে  বাপু । আম  নিয়ে এত   প্রেম "। আমি  বলি ," এত   আম  নয়  অমৃত । আর   নামটাও  যে  ভারী   মীঠে । সিন্দুরী  ।" 



Saturday, April 28, 2012

নীলরতন বাবুর সেই প্রথম কেসটা



ভেবেছিলাম লিখবো না। 

কী হবে লিখে নীলরতন বাবুর গল্প ?

একজন ছাপোষা মানুষের আবার গল্প কী ?

কিন্তু উনি যে এতো তাড়াতাড়ি একজন প্রখর বিশ্লেষণকারী, ব্যতিক্রমী গোয়েন্দা হয়ে দাঁড়াবেন তা কে জানতো ?

রিটায়ার্ড লোক তবুও রুটিন মাফিক চলার অভ্যাস।

হ্যাঁ , আমি সেই নীলরতন বাবুর কথাই বলছি। 

সকাল ছটা  থেকে তাঁর দিন শুরু ..

এক কাপ চা  ...

তারপর নিত্যকর্ম   ...

আধ ঘন্টা খবর কাগজ নিয়ে নাড়াচাড়া  ...

একবার পাড়ায়  ঢু মারা ..

ফিরে  এসে মাসিমার হাতের তৈরি জলখাবার  ...

একটু জিরোনো  ...

তারপর ডায়েরী  লেখা ... কী লেখেন তা কেউ জানেনা - নট ইভেন  মাসিমা। 

তারপর দুপুরের ভোজন .. ..

নাক ডাকিয়ে ঘুমোনো মাস্ট - আড়াই ঘন্টা খানেক ..

বিকেলে পার্কে ঘোড়া এক ঘন্টা  ...

যত পাড়ার   রিটায়ার্ড জ্যাঠাদের আড্ডায় কুড়ি মিনিট মতো বসা  ...

বাড়ী ফিরে টিভির নিউজ  ...

কিছুক্ষন গল্পের  বই বা অন্য কোনো পত্রিকা পড়া   ...

নটার মধ্যে ডিনার  ...

শেষে আবার নাসিকা গর্জন  ...

এহেন আনইন্টারেস্টিং দৈনন্দিন জীবনে হঠাৎ ঝড় বয়ে গেলো। 

নীলরতন  বাবুর  পিসিমণি  দুগ্গাপুর থেকে আমের আচারের একটা বিশাল বোয়েম  পাঠিয়েছিলেন। 

নীলরতন  বাবুর  আবার  আচারের ভিষণ  শখ। 

তবে পিসিমণি  বলে দিয়েছিলেন যে  একটু আধটু বোয়েমে রোদ লাগানোর দরকার। 

মাসিমা তাই রোজ ছাতে বোয়েমটা সকাল বেলা রেখে দিতেন অরে ঠিক দুপুর তিনটে নাগাদ  বাড়ীর পুরোনো ঝি পদ্ম  ওটাকে তুলে রাখতো। 

গোল বাঁধলো এক সপ্তাহ বাদে যখন পদ্ম ছাতে গিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে-কাঁদতে নিচে এসে জানালে যে বোয়েম উধাও।

এতো বড় বোয়েমটা কে নেবে ? কার এতো আচার খাওয়ার শখ.. আর যদি শখই হয়ে থাকে তাহলে বললেই তো হতো।  একটা ছোট শিশি ভোরে দিয়ে দেওয়া যেত...

পাড়ায় খবর  ছড়াতে দেরি লাগলো না। .

নীলরতন  বাবু তড়িঘড়ি  করে পাড়ায়  বেরিয়ে গেলেন। হাতে ডায়েরী। 

ফিরে এসে ঘন্টা দেড়েক  ডায়েরীতে  কী সব  লিখলেন। 

আটচল্লিশ ঘন্টার মধ্যে বোয়েম  ফেরৎ। 

অবাক কান্ড 

কে নিয়েছিল সেটা  বড় কথা নয়....

কী করে পাওয়া গেলো এবং নীলরতন বাবু সেটা কী করে এত শীঘ্র ধরে ফেললেন সেটা শুনে সব্বাই তাজ্জব ..

যেদিন বোয়েম নীলরতন  বাবুর বাড়ীতে ডেলিভার হয়েছে সেদিন থেকে কার কার সঙ্গে কী কী বিষয়ে কোন কোন সময় কত  ঘন্টা ক মিনিট  এবং ক সেকেন্ড কথা হয়েছে  তার পুরো বিবরণ নীলরতন বাবুর ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ। 

যার যার সঙ্গে আচারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে সেগুলো আন্ডারলাইন করা আছে উইথ টাইম। 

এর পর টাইম এনালিসিস করা হয়েছে। কিনি কত বেশি বা কত কম সময় এই বিষয় নিয়ে  কী কী কথা বা তর্ক বিতর্ক করেছেন।  যে কম করেছে তাঁর মনের কোনো আঁধার কোনে  আচারের  প্রতি আসক্তি লুক্কায়িত রয়েছে কিনা। সেটার সাইন্টিফিক ডিডাকশন করা হয়েছে। যে বেশি বলেছে তাঁর তো কথাই নেই.. এরপর এ বি সি এনালিসিস। .. হিউমান সাইকোলজি আরও কত কী......

মোদ্দা কথা এহেন চুলচেঁড়া বিশ্লেষণের পর বোয়েম যে পাওয়া যাবে না এই  বিষয়ে আর কোনো সন্দেহই থাকে না...

নিন্দুকেরাও নীলরতন  বাবুর এই  ডিটেল্ড ইনভেস্টিগেশনের তারিফ না করে থাকতে পারলেন না। 

এর কিছুদিন পর ...

পদ্ম আবার ছাত থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে নিচে নেমে এসে  হাঁক  ছাড়ল , "অ বৌদি ! দাদা বাবুর যে আদ্দিকালের হলুদ রঙের কালো পাড় লুঙ্গি যার পিছনে দুটো ফুটা  ..সেটা আবার কে  কাপড় মেলার তার থিকা উঠায়ে নিসে"। 

নীলরতন  মাসিমা মাত্র পানের বাটাটা  নিয়ে শোবার ঘরে ঠান্ডা  মেঝেতে বসেছিলেন। পদ্মর কথা শুনে, "শুনলে গা .." বলে বসবার ঘরের দিকে ঘাড়টি  ঘোরালেন।

আর মাসিমার বলার সঙ্গে সঙ্গে নীলরতন  বাবু তক্তপোষ থেকে তড়াক করে লাফ মেরে টেবিলের উপরে রাখা ডায়েরীটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। 

পদ্ম ঘরে মাত্র পা দিয়েছিলো।  দাদাবাবুর তড়িৎ গতি দেখে সে কাঁধ ঝাকিয়ে " যাক আর চিন্তা নাই..তাড়াতাড়ি খোয়া জিনিস পাওয়া যাইব .." বলে হাঁপ ছাড়লো। ..

এরপর এক নতুন অধ্যায়ের  সূচনা। 

নীলরতন  বাবুর বাড়ির সামনে প্রায়:সই   লম্বা লাইন দেখা দিতে লাগলো।  কলিং বেল ঘন ঘন বাজতে শোনা যেতে লাগলো।

কারো মেনি 

কারো দুধের প্যাকেট 

কারো কাঁথা স্টিচের পাঞ্জাবির খুলে পড়ে যাওয়া বোতাম 

কারো ডাল বাটা 

মায়  পাশের বাড়ীর  ন্যাকা বৌদির শাড়ির সেফটি পিন 

কারো কিছু  ...আর কারো কিছু  ... হোয়াটেভার 

খোয়া গেলেই নীলরতন বাবু   ডায়েরী সমেত ব্যাস্ত হতে দেখা যেতে  লাগলেন । 

ক্রমশ: নীলরতন  বাবুর প্রখ্যাতি পাড়া  ছাড়িয়ে দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। 

একবার তো মশাই কোন ধ্যাধ্যারা গোবিন্দপুর থেকে এক মালদার আসামি এসে হাজির। 

বললেন, " আমি কৈবল্যদায়িনীপুর থেকে আসছি মশাইয়ের নাম ডাক শুনে...  "

ভদ্রলোকের বিশাল আমের বাগান থেকে কে বা কারা আম  চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে  - সে একটা দুটো আম  নয়,ভাই, কিলো-কিলো ..

নীলরতন বাবুকে তিনি অনুরোধ করলেন ওনার সঙ্গে কৈবল্যদায়িনীপুর যাওয়ার জন্য। 

কিন্তু যেতে  আর হলো না ... নীলরতন বাবু নিজের বসার  ঘরের তক্তপোষে বসেই ভদ্রলোককে চার ঘন্টা ধরে প্রশ্ন করে চোরটি কে এবং তাকে কী ভাবে ধরা যেতে পারে বলে দিলেন।  দুদিন পর এক ঝুড়ি সোনালি  রঙের আম  বাড়ীর দোর  গোড়ায় পৌঁছে যেতেই  পাড়া  শুদ্ধু লোক কনফার্মড হলো যে নীলরতন  বাবুর বিশ্লেষণ  একেবারে অন ডট  লেগেছে।

মোট কথা হলো নীলরতন  বাবুর একঘেঁয়ে রিটায়ার্ড লাইফ দিন কে দিন উত্তেজনাময় হয়ে উঠছে  এবং সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জিনিস যা হারালে জীবন উথাল - পাথাল হয়ে যায় এবং থানা-পুলিশ, কোর্ট কাছারি করেও  কিছুই কাজে আসে না সেখানে নীলরতন  বাবুর বিনা পারিশ্রমিকে টাইম থিওরি , এ বি সি এনালিসিস  আর হিউমান সাইকোলজি আর  দেয়ার। 

জয় হউক। 
 

Sunday, April 22, 2012

কয়েকটা বই আর কিছু স্মৃতি

হঠাত সেদিন বইয়ের আলমারিতে হাথ পড়ে গেল ।ঘাটতে গিয়ে কিছু পুরানো বই বেরিয়ে পড়লো। হলদে পাতা প্রায় মুছে যাওয়া কালি আঙ্গুলের  ঘষা লাগলেই মনে হয় এই বুঝি ছিড়ে যাবে। কিন্তু আহ! সেই জীর্ণ পাতার কী মন মাতানো গন্ধ!!   বই গুলোতে হাত পড়তেই অনেক দিনের আগেকার, বলতে গেলে শৈশবের , কথা মনে পড়ে গেল। বাবু বলতেন ভালো বই পড়তে । তখন অবশ্য ভালো মন্দের পার্থক্য বুঝতাম না।যখন বুঝতে শিখলাম তখন বই  ঘাটার সময় বিরল ।



এইতো সেদিন কালী বাডিতে বই মেলা হয়ে গেল।বাংলা  বইয়ের জগত যে কত বদলে গেছে স্টলগুলোতে ঘুরতে ঘুরতে তাই উপলব্ধি করলাম । বিশ্ব ভারতীর একশত বত্সর পূর্ণ হওআতে এখন রবীন্দ্র রচনা সম্পাদনের অধিকার আর সীমিত নেই। ছোট বড সব সম্পাদকই বই ছাপার অধিকার রাখে।তাই অনেক নাম না জানা পাবলিশার্সের স্টল এও রবীন্দ্র রচনাবলীর সম্ভার। কিন্তু মনটা খুঁত খুঁত করছিল । কী যেন একটা ব্যপার নেই। বইয়ের আকার বদলে গেছে - ছোটো ছোটো লেখা , পাতলা পাতা -  সেই হলুদ মলাটের উপর লাল কালির বাঁকা হাতের লেখায় "রাজর্ষী" বা "বিচিত্র প্রবন্ধ" ভীষণ মিস করছিলাম। টের পেলাম বয়স হয়েছে । পরিবর্তন কে মেনে নেয়ার ক্ষমতা ক্রমে কমে আসছে।


আরও মনে পড়ে... বাংলা শেখার সেই দিনগুলি । আমার প্রথম বাংলা শেখা শিশু ভারতীতে - যাকে আজকের দিনে লোকে বলে প্লে স্কুল ।রেণু আন্টি  আমাদের  বাংলা পডাতেন । শ্যামলা রং , চোখে চশমা , হাঁসি হাঁসি মুখ , নরম মনের মানুষ , বাচ্চাদের ভালবাসতেন । বাচ্চারাও তাঁকে খুব ভালবাসত । সাদা সারি কালো পাড় - বোধহয়  অল্প  বয়সেই বিধবা হযেছিলেন।বিদ্যাসাগর  মহাশয়ের  "বর্ণ  পরিচয়" ওঁর কাছেই শেখা । 


তারপর সেন্ট থমাস স্কুল ...বাংলা শেখায় বাধা পড়লো ।


ক্লাস সেভেনে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে স্কুল বদল - লেডি আরউইন । বাবা বললেন বাংলা স্কুলে পড়লে মাতৃ ভাষাটা চোস্ত  হবে ।  তবে আমার বাংলা শেখা আসলে গল্পের বইয়ের মাধ্যমে । তার মজাই আলাদা । গল্পের রঙ্গীন জগত তো আছেই তার সঙ্গে সেই শতেক বার পড়া আধ ছেঁড়া পুরনো বইয়ের পাতার  মন মাতানো সোদা গন্ধ । তার  নেশা যে সব নেশা ছাপিয়ে পাগল  করে... তার আনন্দ  যে অনির্বচনীয় । যারা সেই আনন্দ  অনুভব  করেছেন  বা সেই নেশায়  ডুবেছেন... তাঁদের  কী আর  কোনো স্কুলের  পাঠ্যক্রমের  দরকার  আছে ? 


Saturday, April 21, 2012

A FEW LINES





একটা ছোটো খাতা
কিছু কালির আঁচর
আর একটা গল্প
ভাবছি লিখে ফেলি
জীবন আর কল্পনার জোট
জমবে ভালো
আর তোমার যদি পড়তে গিয়ে
মনে পড়ে যায়
এই ফাঁকে
কিছু বাশি পুরনো দিনের কথা...

A few yellowed pages
Drops of ink
A little story
Thought I'd pen
A heady mix of life & lies
A perfect blend
Perhaps it might 

Ring a bell...