Tuesday, July 23, 2024

হঠাৎ ..... কাল্পনিক!!



গতকাল সন্ধ্যাবেলায় সুচিত্রা ভট্টাচার্যের একটি উপন্যাস পড়তে পড়তে তন্দ্রা মতন এসে গেছিল। 

হঠাৎ মোবাইলটা বেজে ওঠাতে জেগে গেলাম। 

অচেনা নম্বর। 

কলটা রিফ্লেক্স একশনের মতন রিসিভ করতেই অপর প্রান্তে এক আগন্তুকের স্বর। প্রথমে বুঝতে পারিনি। কথাগুলো জড়ানো জড়ানো। আমি প্রশ্নসূচক উত্তর দেওয়াতে সেই অজানা ব্যক্তি এবার স্পষ্ট ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলো :

"আর ইউ ইন ইন্টেলিজেন্স বিউরো?"

ভদ্রলোকের কথায় বেশ টান আছে। হয় বাঙালি নয় মাদ্রাজী। মাদ্রাজী মানে তেলুগু, তামিল, কন্নড়, মালিয়ালী  - যা কিছু।

আমি না করাতে অপর প্রান্তের ফোনকারী জোর দিয়ে বলল: 

"আই অ্যাম কনফার্মড দ্যাট ইউ ওয়র্ক ফর ইন্টেলিজেন্স বিউরো।"

আমিও ততোধিক জোর দিয়ে বললাম:

"ওয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট?"

জোরটা হয়তো বেশি হয়ে গেছিল। 

আমার প্রশ্নের উত্তরে টক করে লাইনটা কেটে গেলো।

বুকটা ছাৎ করে উঠলো। 

এই অপরিচিত লোকটা কেমন করে জানলো আমার গুপ্ত ইচ্ছার কথা ? 

আমি যে এককালে সী বী আই, সতর্কতা বিভাগ বা এমনি কোনো একটি অনুসন্ধানমূলক দপ্তরে কাজ করতে উদগ্রীব ছিলাম ?

আর স্পাই হওয়া মানে তো একটা দারুন রোমহর্ষক ব্যাপার - নয় কি?

কিন্তু সেই চাকুরিটি হতে হতে হলোনা। 

যিনি আমাকে অফার করেছিলেন তাঁকে অতীব উৎসাহের সঙ্গে উত্তরে বলেছিলাম, "হ্যাঁ স্যার, একবার সুযোগ দিন । সব কটাকে দেখে নেবো।"

ভদ্রলোক মৃদু হেঁসেছিলেন মাত্র। 

তারপর থোর বড়ি খাঁড়া আর খাঁড়া বড়ি থোর। 

যে তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে গেলাম।

ফোনটা বন্ধ করে অনেক ভাবলাম।

কে এই ভদ্রলোক যার আমার ইন্টেলিজেন্স বিউরোতে কাজ করা নিয়ে এত চিন্তা?

আমাকে না হয় ভুল করে ফোন করেছিল কিন্তু সত্যি যার চাকুরি নিয়ে এত দুশ্চিন্তা সে কে?

আর কেনই বা এত দুশ্চিন্তা ?

এই একটি কিছুক্ষণের ফোনচারিতায় আমার হৃদয়ের শুপ্ত বাসনাগুলো আবার  পট পট করে জেগে উঠল।

ভদ্রলোক কোথায় আঘাত করেছেন জানেন কি?

আবার ফোন।

এবার চেনা কন্ঠ স্বর।

আমার স্কুলের বান্ধবী।

ওকে কিছুক্ষণ আগের ফোনের কথাটা বলাতেই কিছু সাবধান বাণী কর্ণপটে গলগল করে পড়ল :

"আজকাল বহুত ফ্রড কল হচ্ছে। তুই জানিস?"

কিছু দুর্ঘটনার বিবরণ....

তারপর

"কোনো আননোন নাম্বার তুলবিই না।" 

গেলো।

দ্বিতীয়বার কাল্পনিক বা কিয়ৎক্ষণের জন্যই হোক আমার জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয়, সবচেয়ে লোভনীয় চাকুরিটা ফেল্টু মেরে গেলো।

অনেকদিন পর বুড়ো বয়সে হাত পা ছুঁড়ে ভেউ ভেউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করলো।

দূরে কোথাও এফএমে বেজে উঠল :

"পাগলা ...আ...আ ...মনটারে তুই বাঁধ... ধ....ধ...., কেন রে তুই ...ই ...ই ... যেথা সেথা পড়িস প্রাণের ফাঁদ ...দ ...দ ...দ "

খুউব দরদে গলা।

পারলাম না।

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ডুকরে ডুকরে কেঁদে ফেললাম।

এখন মনটা হালকা লাগছে।

ভাবছি ভদ্রলোককে পাল্টা ফোন করি ।

"ইয়েস আই ওয়ার্ক ইন ইন্টেলিজেন্স বিউরো। ওয়াট ইজ ইওর প্রবলেম ? মে আই নো?"

আমার কল লগে ওই নাম্বারটা এখনো আছে।

ডিলিট করিনি।

একবার ট্রাই করবো নাকি?

কি বলেন?


Saturday, April 20, 2024

হাঁটি হাঁটি পা পা

যখন ছোট ছিলাম মা ও বাবু নিশ্চয়ই হাত ধরে হাঁটা শিখিয়েছিল। স্মৃতি শক্তি সেই সব অবোধ দিন গুলো মনে করতে পারে না।

শাঠ বৎসর পর আবার হাঁটছি। হাঁটা শিখছি। ব্যাপারটা যে এত কষ্ট ও শ্রম সাধ্য হবে জানা ছিল না।

গাঁটে গাঁটে ব্যথা। কাল মন্দির অবধি, যা আধ কিলোমিটারের ও কম দূরত্বে, অনেক কষ্টে পৌঁছলাম। প্রথমে পুরোনো জুতো তৎপর নতুন জুতো পড়ে ঠিক করলাম মনের ভয় কে জয় করতেই হবে - পাড়ি দিলাম।

পুজো করতে গিয়ে ভগবানের চাইতে জুতো তে নজর বেশি ছিল। মন্দিরে জুতো চুরি, তায় এক্কেবারে বাক্স থেকে সদ্য বার করা, আকছার হয়ে থাকে।

ফেরার পথে থেমে থেমে আকাশ বাতাস দেখতে দেখতে বাড়ি ফেরত।

জীবনের শেষ ধাপ দেখছি, অনুভব করছি। ব্যথা, বেদনা, ক্লান্তি, বাড়ি থেকে বেরোতে অনীহা। আলসেমি। তবু ও বেঁচে আছি।

বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা এখনো যায়নি।

তাই আবার হাঁটতে শিখছি।

হাঁটি হাঁটি পা পা।

Friday, April 19, 2024

ভবিষ্যৎ বাণী







আমার প্রতিবেশিনীর সঙ্গে কথা বলতে বলতে জানতে পারলাম তাঁর সুন্দরী, শিক্ষিতা কন্যাটি আবার ট্যারো জানে। ঝুলে পড়লাম। আমার ভবিষ্যৎ টাও দেখে দিক। রিটায়ারমেন্টের পর পয়সা কড়ির অভাব হবে না তো ?

বেশ কিছু দিন এর পর কেটে গিয়েছে। ওঁর মার কথা মত এগারো টাকা টোকেন মানি ও পাঠিয়ে দিয়েছি। কিন্তু মেয়েটির সময়াভাবে... সঠিক মানসিক প্রস্তুতি... এনার্জি লেভেল... ইত্যাদি আর হয়ে উঠছে না। 

অতএব নো ভাগ্য গণনা।

তার বেশ কিছুদিন বাদে হঠাৎ এক সন্ধ্যায় ফোন। মেয়েটির মা বললে আমার সঙ্গে মেয়েটি কথা বলতে চায়। মানে ওই আর কি - ভাগ্যান্বেষণের সুসময় আগত। 

আমি রোমাঞ্চিত, দুরু দুরু বক্ষে কথপোকথন শুরু করলাম। 

প্রথমেই মেয়েটি আমাকে প্রশ্ন করল আমি কোনো নতুন কাজ করতে আরম্ভ করেছি কিনা ।

আমি  নকারাত্মক উত্তর দিতে সে বললে অদূর ভবিষ্যতে সে সম্ভাবনা নাকি দৃশ্যমান।

আমি যাইপরনাস্তি খুশিত।

কিন্তু তারপরেই একটি অগ্নিশেলে দাহত হলাম।

মেয়েটি বলল, " আন্টি, যার সঙ্গে তুমি কাজে নামবে তাঁর সঙ্গে তোমার রোমান্সের যোগ দেখতে পাচ্ছি। আমি বার বার দেখেছি। কার্ডসগুলো তাই বলছে।"

আমার মাথায় হাত।

জিগালাম, "আমার বয়স জানো তো?। ষাটের ঘরে পা দিয়েছি।"

মেয়েটি আধুনিক ভাবধারায় আমায় সান্ত্বনা দেয় , "বয়সটা শুধু একটা নম্বর মাত্র।"

আমি অন্য দিকে কথা ঘোরাই।

কারণ আমি জানি বয়সটা শুধু মাত্র নাম্বার নয়। বয়সের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ছ দশকের কটু অভিজ্ঞ্যতা, রক্ষনশীল মানসিকতা, নানা প্রকারের ইনহিবিশান, সামাজিক ও পারিবারিক দায়বদ্ধতা, শারীরিক জড়তা। 
যারা ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলে বয়সটা কিছু না তারা অন্ধ। 

এই বেতো ঘোড়া কোনোদিনই রেসের মাঠে নামবে না।

সেই মানসিক দৃঢ়তা আমার নেই।

...

এই ঘটনার পর প্রায় অনেক রাত নানা বিধ রোম্যান্টিক স্বপ্ন দেখেছি যা আমার পরবর্তি গল্পের খোরাক হতে পারে।

তাতে বাধা নেই।

...

Wednesday, February 14, 2024

বীণাপাণি পুস্তকহস্তে দেবি নমস্তে

আজ সরস্বতী পুজো। 
বেশি কিছু লিখছি না।
শুধু কয়েকটা ছবি আপলোড করছি।

সকাল সাড়ে দশটায় বেরোলাম অঞ্জলি দিতে। নিবেদিতা এনক্লেভ কালি বাড়ি।
পৌঁছতে পৌঁছতে এগারোটা।
শুধু চা খেয়েছি আটটা নাগাদ।
উপোষী বলা চলে।
মা শুভ্রবসনা। কিন্তু প্যান্ডেলের ছাত লাল। তাই রোদের আলো লাল হয়ে গিয়ে সব ছবি লালছোঁয়া হয়ে গেছে।

মাকে একলা পাওয়া যাচ্ছিল না। অঞ্জলীর দল। মা মাসীর দল। তারই মাঝে একবার ঝপ করে ক্লিক করলাম।

মা মাসীদের পার্টিসিপেশন বেশি। বাচ্চাদের, পড়ুয়াদের দর্শন বিরল। 

এবার একটু নতুন ডেকরেশনের ছোঁয়া। মন্দির দ্বারের দু ধারে দুই বিবর্ণ পড়ুয়া বর্ন পরিচয় হাতে।
বিদ্যাসাগর মশাইকে অনেকদিন পর সশ্রদ্ধ নমনে।মনটা মজা পেল । হ্যাপি হলো।

শুধু খবর কাগজ দিয়ে তৈরি। অভিনবত্ব আছে।

বাড়ি এসে দিদির হাতের খিচুড়ি আর চাটনি খেয়ে মন  তৃপ্তি পেল।

তারপর  লম্বা ঘুম । 

Monday, February 12, 2024

সিলুয়েট

সেকালে কোনো ফ্যান্সি ক্যামেরা ছিল না।  ছিল না দামী মোবাইল।  নিত্য নতুন টেকনোলজির চল হয়নি।  সেই সময় আমার পিশেমশাইকে সাদামাটা ক্যামেরায়ই  দারুন অ্যাঙ্গেলে সাদা কালো ছবি তুলতে দেখেছি। অ্যালবাম ভর্তি। পিশেমশাইয়ের ছিল ঘোরার শখ আর ছবি তোলার।  ওঁর তোলা ছবি আমার কাছে খুব কম আছে। তাই ওনার কৃতি তুলে ধরতে পারলাম না।

আমাদের পরিবারে আর এক গুণী ব্যক্তিত্ব ছিলেন আমার সেজো মামা। তিনি খুব ভালো তবলা বাজাতেন তাই আমার মামাতো মাসতুতো ভাই বোনেরা ওনাকে ধিন মামা বলে ডাকতো। মা ডাকতেন দাদামনি বলে। তাই আমি আর দিদিও ওঁকে দাদমনি বলে ডাকতাম। দাদামনি যেকোনো গান শুনে ঝটপট হারমোনিয়ামে তুলে ফেলতে পারতেন। উনি ভালো খেলোয়াড় ও ছিলেন - ব্যাডমিন্টন, তাস, ক্যারাম ইত্যাদি। কিন্তু সবচেয়ে জবরদস্ত ছিল ওনার গল্প বলার টেকনিক -  যাকে আজকালকার দিনে বলে আর্ট অফ্ স্টোরিটেলিং। 

উনি আমাদের বাড়ি আসলেই ওনাকে আমরা ছেঁকে ধরতাম গল্প শোনানোর জন্য। ওনার মুখেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক লেখক লেখিকাদের গল্প শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। হয়তো ওনার কাছ থেকেই গল্প শুনতে শুনতে গল্প লেখার বা বলার নেশা অজান্তেই আমায় বশ করেছিল । ফ্রেঞ্চ লেখক মোপাসার লেখা প্রচুর ছোট গল্প ওনার মুখেই শোনা। গল্পের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর জায়গাটিতে উনি ইচ্ছে করে ব্রেক নিতেন আমাদের উত্তেজনা ও গল্পের সেই মোড়টির পরে কি হবে জানার প্রবল ইচ্ছেটিকে প্রবলতর করার জন্য। সিগারেটে একটি সুখটান দিতে দিতে ফরমায়েশ করতেন এক কাপ চায়ের। যতক্ষণ চা না আসত ততক্ষণ গল্পে বিরতি আর সেই মুহুর্তে আমাদের উদগ্রীবতা চরম পর্যায়ে পরিণত হতো । সে কি এক্সাইটমেন্ট! আধুনিক যুগে পী ভী আর, ইউ টিউব, ও টি টি তে অভ্যস্ত বাচ্চাদের অবশ্য আমাদের কেবল প্রাচীন রেডিও ব্যতীত অন্য কোনো মনোরঞ্জন  ও এক্সপোজারের মাধ্যম না থাকার দরুন কথকের সামনে বসে রসিয়ে রসিয়ে তাঁর গল্প বলা ও আমাদের মুখ হা করে শোনার তাগিদ কল্পনা করা কঠিন।

দাদামনির আরেকটি হবি ছিল ফটোগ্রাফি। 

তখনকার দিনে ভালো ফটোগ্রাফি কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। ছবি তুলতে গেলে ঠিক সময়, পর্যাপ্ত আলো, সঠিক অ্যাঙ্গেল ইত্যাদির খেয়াল রাখতে হতো। সেকেলে ক্যামেরার লেন্স অ্যাডজাস্টমেন্ট করাই ছিল বিরাট কসরত।

দাদামনির তোলা মা এবং মাসীর (দুজনেরই বিবাহের পূর্বে) এই ছবিটি আমার খুব প্রিয়। বাবা বলতেন এটা সিলুয়েট। খুব কঠিন ফটোগ্রাফি। এখানে ওনার কৃতি তুলে ধরলাম আপনাদের জন্য।

তবে দু:খের বিষয় পিসেমশাই ও দাদামনি দুজনেরই ব্যক্তিগত জীবন সুখের ছিল না। সে গল্প আরেকদিন।


ছবিটি একটি পুরোনো পারিবারিক অ্যালবাম থেকে নেওয়া। মেইনটেন্যান্স নেই তাই নষ্ট হতে চলেছে। কেমন ভাবে ছবিটিকে বাঁচিয়ে রাখা যায় ভাবছি। আপনাদের কোনো পদ্ধতি জানা থাকলে নিশ্চই কমেন্টে লিখে জানাবেন।

শুভ রাত্রি।

Tuesday, January 23, 2024

বসে আছি পথ চেয়ে

চুপচাপ ।

বাইরে প্রচন্ড ঠান্ডা।

কুয়াশায় ঘেরা।

ধোঁয়াটে।

কাঁচের জানালাটা মাঝে মাঝে জলের ধারায় ভিজে যাচ্ছে। যেন বৃষ্টির ধারা ঝরে পড়ছে। আসলে কুয়াশা জলের ধারায় পরিণত হচ্ছে । আর কিছুই নয়।

এইরকম আবহাওয়ায় হিটারের সামনে বসে ভুতের গল্প বা রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাস বা টিভিতে এরকম ধরনের সিনেমা বা সিরিজ দেখার মরশুম।

কিন্তু কিছুই করছি না।

পায়ের মোজাটা ভিজে ভিজে লাগছে।

কেন?

আমি তো জলে যাইনি।

তবে?

ঝুঁকে দেখি একরাশ রক্ত।

পায়ের তলার দিকটা।

মোজা ভিজে গেছে।

না কোনো রক্তাক্ত খুনের সীনে পায়ের ছাপ ফেলে ( জুতো ছাড়া ?) আসিনি।

কাউকে রাগের বসে নিশুতি রাতে ঝোপ বুঝে কোপ মারিনি।

তবে?

চিল ব্লেন...

কনকনে ঠান্ডায় পায়ের আঙুলগুলি ফুলে চুলকুনি হয়। চুলকে চুলকে ফেটে রক্ত বেরোয়। 

তারেই কয় চিল ব্লেন ।

ওই আর কি!

এই হাঁড় কাঁপানো জানুয়ারি মাসের শীতে বাড়িতে আটকে থেকে একটা রোমহর্ষক পরিস্থিতির সুচনা করলাম।

আর কি!!!🤪🤪

 

এখন একটু খানি রোদের ঝলক দেখা গেছে।

দেখা যাক কতক্ষন থাকে।

ঠান্ডা কমে কিনা।

তার সঙ্গে চিল ব্লেন । 🤞🤞


#বাংলাব্লগ #আজকেরডায়েরি #শীত #রক্তাক্তব্যাপার #রোমহর্ষক



                                                                                                                             


                                                                                                             



                                                                                                             


Sunday, May 28, 2023

অবিনাশ বাবুর হবি



অবিনাশ বাবু ছাপোষা লোক। একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে কেরানির কাজ করছেন বহু বছর ধরে। অবিবাহিত তাই কোনো হুজ্জুত নেই। সপ্তাহে পাঁচ দিন নটা টু পাঁচটা অফিস। শনিবার সকালে একটা স্কেচ বুক নিয়ে বেরিয়ে পড়া। হ্যাঁ - অবিনাশ বাবুর এই এক হবি। যত অজানা, অচেনা মফঃস্বল, গাঁয়ে, গঞ্জে ঘুরে ঘুরে ভাঙ্গাচোরা বাড়ি খুঁজে বার করা, যেই বাড়িতে কেউ বসবাস করে না - পরিত্যক্ত; তার ছবি আঁকা;  শুধু ছবি আঁকা নয় - সেই বাড়িটি যদি আবার নতুন করে গড়ে তুলতে হয় তাহলে তার রূপ কেমন হতো বা হতে পারে - মানে আগাগোড়া নতুন -  প্রত্যেকটা ঘরদোর, বারান্দা, রান্নাঘর, বাথরুম ইত্যাদি - তার ও স্কেচ তৈরি করা।

এককালে অবিনাশ বাবুর আর্কিটেকচার নিয়ে পড়াশোনা করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু যৌথ পরিবারের দায়িত্ব, অভাব অনটন, ওই যা হয় আর কি। কিন্তু অবিনাশ বাবু ওনার কলেজ জীবনের আকাঙ্ক্ষাকে হবি বানিয়েই এখন পরিতৃপ্ত। পয়সাও বেশি খরচ হয় না আবার প্যাশনেরও খিদে মেটে। মানে একটা মাঝপথ বেছে নেওয়া এই আর কি। এই মাঝপথই মধ্যবিত্তদের মেরুদন্ড - সমঝোতা, অ্যাডজাস্টমেন্ট, কম্প্রোমাইজ - করেই সন্তুষ্ট থাকা।

এই সপ্তাহান্তে অবিনাশ বাবু পাড়ি দিলেন বেশ কিছুটা দুরে। গুগল দেখে। ট্রেনে করে চাকদা। তারপর বাসে করে অক্ষ নামে এক অজ গ্রাম। সেখান থেকে সাইকেল রিকশা করে তালিপুর। তার আগে কোনো বাহন যায় না। তাই হাঁটা দিতে হলো। অবিনাশ বাবুর তাতে কোনো আপত্তি নেই। আজ ভোরে বৃষ্টি হওয়াতে গরম বেশ কম। ফুরফুরে হাওয়া ও দিচ্ছে। অবিনাশ বাবু এরকম বহু পায়ে হেঁটে সফর করেছেন। এবার অবশ্য একটু বেশি হাঁটতে হলো। 

ধু ধু করছে মাঠ। মাঠ যেখানে শেষ সেখানে বাড়িটা শুরু। একেবারে ঝরঝরে। দরজা জানালা বলতে প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। আছে শুধু বাড়িতে ঢোকার গেটটা। গেটের উপর একটা গাছ ঝুঁকে পড়েছে। কামিনী ফুলের বোধহয় । ফুল হয় কি হয় না কিন্তু গাছটা আছে। গেটের সামনে একটা ভাঙ্গা রোয়াক। অবিনাশ বাবু রোয়াকে বসে গেট দিয়ে উঁকি মারলেন। বেশ অনেক খানি জায়গা পেরিয়ে কিছু ধাপ সিড়ি উঠে গেছে। মোটা মোটা থাম দিয়ে ঘেরা বারান্দায়। থামগুলো যে এখনও দাঁড়িয়ে আছে দেখে অবিনাশ বাবুর অবাক লাগলো। খালি জায়গাটায় এক সময় মনে হয় বড় একটা পুকুর ছিল। সেই পুকুর ঘিরেই বাড়িটা। 

অবিনাশ বাবু অনেক ক্ষন বাড়িটার দিকে তাকিয়ে বসে রইলেন। এত বাড়ি ঘেটেছেন, এঁকেছেন, আগাগোড়া নতুন ভাবে গড়বার চেষ্টা করেছেন কিন্তু এই বাড়িটার একটা আলাদা ব্যাপার আছে। ব্রিটিশ আমলের তো বটেই তার ও চাইতে পুরোনো হতে পারে। এখনও যে টিকে আছে এটা আরেকটা আশ্চর্য। তাছাড়া এই রোয়াকে বসে অবিনাশ বাবুর কেমন একটা আচ্ছন্ন ভাব ঘিরে ধরছে। মনে হচ্ছে যেন -

"সো ইউ হ্যাভ  অ্যারাইভড" - অবিনাশ বাবু চমকে পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখলেন একজন খ্যাংরা কাঠির মতন ঢ্যাঙা লোক দাঁড়িয়ে মুচকি হাঁসছে । পরনে তার ময়লা, অনেক বছরের পুরনো , বহুল ছিদ্রযুক্ত গেঞ্জি আর ততোধিক ময়লা ও ছিদ্রযুক্ত ধুতি ল্যাঙ্গটের মতন করে জড়ানো। কিন্তু চোখের চাহনিটি প্রখর, বুদ্ধিদীপ্ত। আর ইংরিজিটা তো এ্যাকেবারে পারফেক্ট প্রায় ইংরেজদের মতন। গলার স্বরটা ও গম্ভীর তবে ঠোঁটের কোণের হাঁসিটি শিশুসুলভ।

এ বাড়িতে যে কেউ বাস করে অবিনাশ বাবুর জানা ছিল না। উনি নিতান্তই অপ্রস্তুত ভাবে সেটা জানাতে লোকটি প্রাণ খুলে হা হা করে হেঁসে বলল,"সেটা কোনো ব্যাপার নয়। অনেকেই হয়ত এটা জানেনা। আর আপনার গুগল বাবাজির তো একদমই জানার কথা নয়। তবে আপনি আপনার কাজ চালিয়ে যান। স্কেচটা কি কমপ্লিট?"

অবিনাশ বাবু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, " আপনি কি করে জানলেন আমি স্কেচ করতে এসেছি?" ভদ্রলোক অবিনাশ বাবুর কোলের উপর রাখা খোলা খাতাটির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন। অবিনাশ বাবু ভুলে গেছিলেন কখন ভাবতে ভাবতে উনি খাতাটা খুলে ফেলেছেন। 

" না , এখনও শুরু করিনি। জায়গাটা ফীল করছিলাম।"
লোকটি পাশে এসে বসে মাথা নাড়লো, " এই বাড়ির লম্বা ইতিহাস। বুঝলেন অবিনাশ বাবু।"

অবিনাশ বাবুর আবার অবাক হওয়ার পালা। "আমার নামটা....?"  উত্তরে মুচকি হাঁসি আবার স্কেচ বুকের দিকে আঙুল দেখানো। "যখন কাজ আরম্ভই হয়নি তাহলে আগে একটু চা হয়ে যাক। তবে এখন কিন্তু দ্বিপ্রহরের খাবার সময়। "

অবিনাশ বাবু মোবাইলে দেখলেন সময় বারোটা পঁয়তাল্লিশ। সত্যিই তো এতখানি সময় কেটে গেছে উনি খেয়ালই করেননি ।

"তাহলে রান্নাটা চাপিয়ে চায়ের ব্যবস্থা করে আসি।" শত মানা করা সত্বেও ভদ্রলোক শুনলেন না। " আমি কিন্তু ভালো রন্ধন জানি। একটু সময় লাগবে। তবে তার আগে চা। " বলে লোকটি উঠে গেট দিয়ে ঢুকে বারান্দায় থামের আড়ালে যেন মিলিয়ে গেল।

অবিনাশ বাবু বসে রইলেন। এই প্রথম তাঁর স্কেচ বানাতে ইচ্ছে করছে না। এটাকি এতটা পথ হেঁটে আসার ক্লান্তি? না: বাড়িটার একটা অদ্ভুত আকর্ষণ অবিনাশ বাবুকে বার বার আচ্ছন্ন করে ফেলছে। মনে হচ্ছে যেন চোখের সামনে অনেক রকমের দৃশ্য দেখছেন। যখন এই বাড়িতে বসত ছিল। লোকেদের আনাগোনায় ভরপুর। এই মাঠটা যখন জনপদ ছিল। ঘোড়ার গাড়ির শব্দ। দারোয়ানের হাঁক। বাবুদের পায়ের জুতোর মচমচ আওয়াজ সিড়ি বেয়ে নেমে আসছে ।

ভদ্রলোক দু খুঁড়ি চা নিয়ে হাজির। কাপ নয় । গেলাস নয়। খুঁড়ি । অবিনাশ বাবু অবাক হওয়ার ক্ষমতা ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে। চুমুক দিলেন। চাটি চমৎকার। দামী, সুগন্ধি চা। 

"কি স্কেচ হলো?" ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন ।

অবিনাশ বাবুর না শুনে উনি আবার মাথা নাড়লেন।

"এই বাড়ির অনেক দিক আছে। একদিনে আপনার স্কেচ তৈরি হবে না। আপনি বরং দু এক দিন থেকে যান। ঘুরে ফিরে ভালো ভাবে দেখুন তারপর না হয় আঁকবেন।"

অবিনাশ বাবু অফিসের অজুহাত দিয়ে মানা করতে, ভদ্রলোক কথাটা "অফিস থেকে ছুটি ও তো নেওয়া যায়" বলে একদম উড়িয়ে দিলেন। অবিনাশ বাবুকে বাইরেটা ভালো করে ঘুরে দেখে স্কেচটা কিরকম বানাবেন তার আইডিয়া নিতে আর "আমি রান্না সেরে আসছি" বলে আবার থামের আড়ালে উধাও হলেন।

অবিনাশ বাবু বেশ কিছুক্ষণ বসে থেকে ঠিক করলেন আর না। স্কেচ আজকেই মোটামুটি শেষ করে বাড়ি ফিরবেন। আবার না হয় আরেকদিন ভদ্রলোকের আতিথেয়তা গ্রহণ করা যাবে। তবে এই ভগ্নাবশেষ ভবনে অতিথি সেবার কি করে ব্যবস্থা হতে পারে অবিনাশ বাবুর বোধগম্য হলো না।

মোবাইলে দেখলেন বিকেল চারটে। ভদ্রলোক বেশ কিছুক্ষণ হলো ভেতরে গেছেন। অবিনাশ বাবুর  পেটে একটা কুনকুনে ব্যথা উঠছে। অনেক ক্ষণ না খেলে পেট খালি থাকার ব্যথা। সেই ভোর পাঁচটা নাগাদ এক কাপ চা আর দুটো মারি বিস্কিট খেয়ে বেরিয়েছেন। সাধারণত: পথেই কোনো দোকানে অবিনাশ খেয়ে নেন। কিন্তু আসার পথে এমন কোনো দোকান ও পড়েনি আর অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় খাবার কথা মনেও ছিল না। 

অবিনাশ বাবু কাঁধের ঝোলায় হাত গলিয়ে পেন্সিল আর রাবার টা বার করলেন। এই যা:!পেন্সিলটা যে এক্কেবারে নতুন। ছোলা হয়নি। ব্যাগে হাত গলিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজি করে ও সার্পনারটা পেলেন না। কাটারটা ও তাড়াহুড়োতে আনতে ভুলে গেছেন । এখন একমাত্র বিকল্প বাড়ির ভেতরে ঢুকে রান্নাঘর থেকে একটা ছুরি চেয়ে নেওয়া। অবিনাশ বাবু পা বাড়ালেন।

বাইরে সূর্য্য পশ্চিমের দিকে হেলে পড়েছে। তবু ও আলোর রেশ আছে কিছুটা। দালান পেরিয়ে ভিতরটায় ভীষনই কম আলো। অনেক গুলো ঘর। রান্নাঘরটা কোন দিকে অবিনাশ বাবু অনেক ঘুরেও ধরতে পারলেন না। বাড়ি নয় যেন ভুলভুলইয়া । একবার ভাবলেন বেরিয়ে পড়া যাক। আজ এখানেই ইতি। কিন্তু অবিনাশ বাবুর সেটা স্বভাব বা এতদিনের অভ্যাস বিরুদ্ধ। হঠাৎ খুক খুক করে কাশির আওয়াজ এলো ।অবিনাশ যেখানে দাঁড়িয়ে ঠিক তার বাঁ দিকে। এগিয়ে যেতেই দেখলেন ঠিক ধরেছেন। এটাই রান্নাঘর আর ভদ্রলোক একটি মাটির উনুনের সামনে উবু হয়ে বসে আছেন। উনুনটি কিন্তু নেভানো। আদৌ জ্বালানো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। সারা ঘরে রান্নার কোনো সামগ্রী বা বাসনপত্র নেই। রান্না হয়েছে বলে মনেই হয় না। 

ভদ্রলোক স্মিত হেসে আপ্যায়ন করলেন। যেন জানাই ছিল যে অবিনাশ আসবেন। " আসুন! আপনি ঠিক জায়গায় এসে পড়েছেন।" 

"না মানে একটা ছুরি হবে। পেন্সিল কাটারটাই আনতে ভুলে গেছি।" অবিনাশ লজ্জিত হয়েই বললেন।

"হ্যাঁ! সব আছে। ছুরি, কাঁচি, দা। এই নিন " বলে ভদ্রলোক হাত বাড়ালেন। তাঁর হাতে চকচকে একটি ছুরি যেন এখনই শান দেওয়া হয়েছে। আর ছুরির গাঁয়ে ওটা কি লাগা - কালচে লাল রং? রক্ত না! 
আর ঠিক সেই সময় ঘর অন্ধকার কর সুজ্যিদেব টুপ করে আকাশের পশ্চিম কোনে ডুব দিলেন।

***

অবিনাশ বাবুর সেবার স্কেচ করা হয়েছিল কিনা জানিনা তবে দু সপ্তাহ আগে খবরের কাগজে একটি ছোট পুলিশী বিজ্ঞপ্তি বেরিয়েছিল।

নাম - অবিনাশ সেন
বয়স - ৪০ বছর
উচ্চতা - ৫.২"
গায়ের রং - ফর্সা
নাকের ডান পাশে একটি আঁচিল আছে
পরনে - কালো প্যান্ট আর সাদা বুশ শার্ট
মানসিক স্তিথি - সুস্থ
শনিবার ৮ই এপ্রিল ২০২৩ থেকে নিখোঁজ

একটা ছবিও দেওয়া ছিল। এই ব্যক্তিটির কোনো খবরাখবর পেলে অমুক থানায় জানাতে। 

আপনারাও একটু খেয়াল রাখবেন। ভদ্রলোকের কাঁধে  ঝোলায় একটা স্কেচ বুক, নতুন পেন্সিল আর রাবার পেলেও পেতে পারেন। এঁকে শেষ তালিপুর, চাকদা জেলার আশেপাশে দেখা গেছে।

***