Friday, September 16, 2022

মুষিক পুরাণ


আমাদের নিচের তলার ফ্ল্যাট। তাই প্রায়ই বাড়িতে ছোট  বড় নানান সাইজের ইঁদুর ঢুকে পড়ে। খেলাধুলা করে। নাচানাচি করে। আমার পোষ্যটি দার্শনিকের মতন তাকিয়ে তাদের নাচাকোদা, ছোটাছুটি দেখে ফোত করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। ল্যাও ঠ্যালা। 

ফ্ল্যাটের সামনেই পার্ক। সেই পার্কে আবার বিশাল বড় বড় সাইজের ইঁদুর, যাদেরকে ইংরেজিতে রোডেন্ট বলে, লাফিয়ে বেড়ায়। ব্যালকনিতে রাত্রে তাদের ডাকাডাকি, হুড়োহুড়ি শোনা যায়। চিকার দল ও আছে। তাদের কথোপকথন কানে আসে। এদের মধ্যে কোনটি যে গাড়ির মধ্যে ঢুকে তার কাটে, পাইপ কাটে বলা মুশকিল। তবে এ ঝঞ্ঝাট ও  আমাকে একাধিকবার পোয়াতে হয়েছে। 

মুষিকের আগমনে ইঁদুর কল, আঠা দেওয়া বই যাতে ইঁদুর চিপকে যেতে পারে ইত্যাদির ব্যবস্থা বাড়ির ভিতর রাখা অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

কিন্তু এত সব ব্যবস্থা সত্বেও এবার যাঁর  চরণ ধুলি আমাদের বাটিতে পড়েছে সে যে মহা ধুরন্ধর তা বেশ ভালোই বোঝা যাচ্ছে। ইঁদুর কলে ঘী দেওয়া রুটি থেকে মাংসের টুকরো দিব্যি সে আত্মসাৎ করে আমাদের কলা দেখিয়ে আশেপাশে ল্যাজ উঠিয়ে নির্লজ্জের মতন খেলে বেড়াচ্ছে। দেখে গা জ্বলে যাচ্ছে। অথচ কিচ্ছুটি করার উপায় নেই কারণ আমার "সক্রেটিস" পোষ্য নির্বিকার চিত্তে তাঁকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। একবারও থাবা উঠিয়ে শাসানো তো দূরের কথা ভৌ ভৌ পর্যন্ত করছে না।

শেষ পর্যন্ত আঠা লাগানো বইটিই কাজে এলো। ঘুরন্ত জামাই ( মহিলা কিনা জানিনা তবে জামাই আদরে বাঁদর হয়ে যাচ্ছে তাই জন্যে আর কি...) শেষে আঠা যুক্ত বইয়ে ধরা পড়লো। তাঁর শেষ সৎকার মানে তাঁকে বই থেকে ঝেড়ে পার্কে ফেলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হলাম। তবে আঠা মুক্ত হয়ে তাঁর শারীরিক অবস্থা খুব একটা সুখকর ছিল না। প্রায় নির্জীবই বলা চলে। দুর্ভাগ্য বসত: এক জোড়া কুকুর তাঁর পিছন নিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ইন্দুরটির কী দশা হয়েছিল বলতে পারবো না।

তবে তাঁর দুর্বল শরীর দেখে কষ্ট হচ্ছিল। যাইহোক জীব তো ! আর জীব হত্যা মহাপাপ। মানুষের জীবনের এটাই সবচেয়ে বড় contradiction।  যা সে পায় না বা যতক্ষণ পায় না ততক্ষণ সে ছটফট করে নানা বিধ উপায়  খোঁজে তাকে পাওয়ার  - তা সে কোনো প্রাপ্তি হোক বা বিপদ থেকে মুক্তি হোক। কিন্তু সফলকাম হয়েও সন্তুষ্টি থেকে সে ক্রোশ দূরে থাকে হয় আরো পাওয়ার লোভে বা পেয়েও অশান্ত চিত্ত হয়ে আর বিবেকের তাড়নায়  ছটফটিয়ে।

আশা করি একটি মুষিকের শেষ কৃত্যের ভাগী হয়ে আমি যেই দর্শন লাভ করেছি তদ্দারা আপনারা যথাযথ অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ  বোধ করবেন।

আচ্ছা রাখি তাহলে ..  

Tuesday, September 06, 2022

মণি মাসির সোলো ট্র্যাভেল

 











বেশ ফুরফুরে হাওয়া। 

আকাশটা গাঢ় নীল।

ছোটো ছোটো ধপধপে সাদা মেঘ ভেসে চলেছে যেন স্বচ্ছ জলের ধারার উপর বহমান সাদা পাল তোলা নৌকোর সারি।

একটা ঝিরঝিরে পাহাড়ী ঝর্ণা পাথুরে রাস্তা বেয়ে নেমে গেছে নিচে কোথাও।

মণি মাসির জায়গাটা ভালো লেগেছে।

কাছেই একটা গ্রাম আছে। কিন্তু এই পাহাড়ের কোলে বসতি কম। শহর থেকে খুব কাছেও নয় আবার খুব যে দুর তাও বলা চলে না। কে বলেছিল এই অচিনপুরের কথা। পাড়ার দত্ত জেঠু।

একা ঘুরতে যাওয়ার জন্য আইডিয়াল। মণি মাসির অনেক দিনের শখ সোলো ট্র্যাভেলের। দাদা কম কথার মানুষ। শুধু বলেছিলেন দেখেশুনে যেও। বৌদি বিশেষ  কিছুই বলেননি। দাদার শ্বাশুড়ি দাদা বৌদির সঙ্গেই থাকেন। তিনি শুধু আড়ালে বৌদিকে বলেছিলেন "যত্ত সব। সোলো আবার কী রে?" বৌদি কোনো উত্তর দেননি।

মণি মাসির রিটায়ারমেন্ট হয়েছে গত মাসে। চল্লিশ বছর স্কুলের শিক্ষিকা হিসেবে ওনার যথেষ্ঠ নাম ছিল....না এখনও আছে। অঙ্কের এমন ভাল টিচার হয় না এটা সবাই এক কথায় মানত .... এখনো মানে। এগারো বারো ক্লাসের পড়ুয়াদের মারা নিশ্চিন্ত ছিল যে রিটায়ার করে মণি মাসি প্রাইভেট টিউসান নেবেন আর তাদের অকালকুষ্মান্ড বাচ্চাগুলোর একটা হিল্লে হয়ে যাবে। কিন্তু তাদের মাথায় পড়লো বাজ।

আসলে মণি মাসিকে কেউ অঙ্কের টিচার ছাড়া আর কিছু কোনোদিন ভাবেনি। কিন্তু মণি মাসির একটা স্বপ্নের জগৎ আছে যেটাকে তিনি অঙ্ক কষতে কষতে ও জিইয়ে রেখেছিলেন। আর সেটা হলো অজানা অচেনা জায়গা ভ্রমণ তাও আবার একক।

চল্লিশ বছর ধরে ইস্কুলে ছাত্র - ছাত্রীদের চিল্লামেল্লি, দাদা বৌদির কনস্ট্যান্ট আনুগত্য, দাদার শ্বাশুড়ির অনুচিত এবং অকারণ ঠোনা - এই চিরাচরিত জীবনের একঘেয়ে রুটিন থেকে বেরিয়ে, কোনো অচেনা অজানা জায়গায়, যেখানে তাঁকে কেউ চেনে না বা জানে না, সেখানে কিছুদিন বিশ্রাম - একেবারে স্বর্গীয় অনুভুতি!

মণি মাসিকে কেউ কখনো দিদি বা দিদিমণি বলে ডাকেনি। কেন? বলা মুশকিল। ইস্কুলের ছাত্র - ছাত্রী, সহকর্মী, পাড়ার আবালবৃদ্ধবনিতা মায় নবজাগরণ বিদ্যালয়ের প্রিন্সিপাল, (যেখানে মণি মাসি নিজের জীবনের অর্ধেকটা কাটিয়েছেন), শম্ভুনাথ ভটচার্জি বাবুও মণি মাসিকে মণি মাসি বলেই চিরকাল ডেকে এসেছেন। হয়তো মণি মাসির মোটাসোটা ভারিক্বী পার্সোনালিটির জন্য.... হয়তো বা মণি মাসির মধ্যে একটা ইউনিভার্সাল মাসি - মাসি ভাব আছে.... হয়তো.... সে যাকগে। এখন মোদ্দা কথা হলো মণি মাসি তার রিটায়ার্ড লাইফ  ভরপুর এনজয় করছেন ।

ঝর্নার ধারে ছোটো বড় অনেক রকমের পাথর। তাদের নানান সাইজ। পাথরের ওপরটা বেশ মসৃণ। মণি মাসি একটা বড় পাথর বেছে নিয়ে পা ঝুলিয়ে বসলেন ঠিক যাতে জলের ধারা তাঁর পায়ের আঙ্গুল গুলো ছুঁয়ে যায়। জলটা বেশ ঠাণ্ডা কিন্তু সুদিংও। মণি মাসির আরাম বোধ হচ্ছে। মনটা একটা অদ্ভুত আনন্দে ভরে উঠছে। আনন্দ নয় ... একটা স্বাধীন, সম্পূর্ন সত্তার  অনুভুতি....নিজেকে একটা উড়ন্ত পাখির মতন লাগছে। মণি মাসি এই শাঠ পার হওয়া জীবনে কখনো এরকম একটা প্রাণ খোলা, বন্ধন বিহীন একসিস্টেন্স অনুভব করেননি।

মণি মাসির প্রাণের  উচ্ছ্বাস আর ঝর্ণা ধারার জলতরঙ্গ মিলে মিশে একাকার হয়ে গেলো। মাসি গুনগুনিয়ে উঠলেন.... সেই কোন যুগে স্কুলের কোরাসে গাওয়া ...

তোমারই ঝর্ণা তলার নির্জনে
মাটির এই পরশ আমার
ছাপিয়ে গেলো কোন খানে... এ... এ.... এ

"বাঃ!"

মণি মাসি চমকে উঠে পিছনে তাকিয়ে দেখলেন। এই নির্জন ঝর্নার ধারে যে অন্য কেউও আছে সেটা তো জানা ছিল না।

ভদ্রলোক বেশ সুপুরুষ। দুধে আলতারং। পেটানো শরীর। লম্বায় ছ ফুট তো বটেই। এক মাথা সাদা ধপধপে চুল। চোখে চশমা। নীল টি শার্ট। ছাই রঙা প্যান্ট। পায়ে সাদা স্নিকার। গলায় একটা ক্যামেরা ...না বাইনোকুলার ঝুলছে। চেহারায় আভিজাত্য সন্দেহাতীত ভাবে ছলকে পড়ছে। বয়স শাঠ কিংবা সত্তর হবে।

"আপনার গলাটা তো বেশ।"

মণি মাসি লজ্জায় আড়ষ্ট। মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না। কেউ যদি বলতো মণি মাসি অঙ্কে মাস্টার বা পারদর্শী তাহলে হয়ত তিনি তাচ্ছিল্যের হাঁসি হাঁসতেন। কিন্তু গান? মণি মাসিকে বোধহয় কেউ বাথরুমেও গুনগুন করতে শোনেনি।

"এখানে কি বেড়াতে? "

মণি মাসি সামান্য মাথা নাড়লেন।

"এখানে সচরাচর কেউ একটা বড় আসে না। বড় নির্জন। আজকাল লোকেরা হট্টগোল বেশি পছন্দ করে। যাক, আপনি এসে পড়েছেন ভালো লাগলো। কতদিন?"

মণি মাসি কোনো রকমে আড়ষ্টতা কাটিয়ে খুবই আস্তে বললেন, "এই পাঁচ দিন।"

"ভালো। কোথায় উঠেছেন? ডাক বাংলোয়? ওছাড়া তো আর এখানে কোনো থাকার জায়গা নেই।"

মণি মাসি আবার আস্তে করে মাথা নাড়াতে ভদ্রলোক "তাহলে আবার দেখা হবে" বলে ঝর্নার ধার ধরে সোজা হেঁটে চলে গেলেন।

মণি মাসি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে বাংলোর দিকে ফিরে এলেন। তিনি  কাল যখন চেক ইন করেছিলেন তখন বাংলোর ম্যানেজার হাথ কচলে কিন্তু   কিন্তু করে জিজ্ঞেস করেছিলেন মণি মাসির একা থাকতে অসুবিধে হবে কিনা কারণ বাংলোতে তখন আর কেউ ছিল না। মণি মাসি ভিতু হলে কি আর সোলো ট্র্যাভেল করেন। তিনি মাথা ঝাঁকিয়ে জানিয়েছিলেন যে তাঁর কোনো অসুবিধে হবে না। এ ভদ্রলোক বোধহয় আজই এসেছেন যখন মণি মাসি এধারটা এক্সপ্লোর করতে বেরিয়েছিলেন।

বাংলোয় সকালে ম্যানেজার বাবু থাকেন। তিনিই আবার  রিসেপশনিস্ট। সকালে রান্নার লোক ও থাকে। ভালো রাঁধে। রাত্রির খাবার বানিয়ে চলে যায়। রাত্রে কেয়ারটেকার থাকে। আর আছে বাচ্চু। সে বাংলোতেই চব্বিশ ঘন্টা থাকে। কোথাও যায়না।

রাত্রে পাতলা মাছের ঝোল দিয়ে পেট ভরে ভাত খেয়ে মণি মাসি ঠিক দশটা নাগাদ বিছানায় গা এলালেন। মাঝ রাত্রে হঠাৎ ঘুম ভেংগে গেল। দরজার নিচে আলোর ঝলক দেখে মণি মাসির মনে হলো হয়তো কেউ বাংলোয় চেক ইন করেছে। শহর থেকে অচিনপুর
আসা যাওয়া শুধু বাসেই হয়। খুব কম লোক এখানে আসে। তাদের মধ্যে ট্যাক্সি বা নিজের গাড়ি করে আসার লোক বিরল। রাতের বাস প্রায়: সই লেট করে। তাই যেই এসে থাকুক তার পৌঁছতে দেরি হয়েছে।

করিডোরে আসা যাওয়ার নানা রকম শব্দ। খস খস ঘস ঘস - মাল টানার..... তারপর পায়ের শব্দ। একটা ঘরের দরজা খোলা তারপর বন্ধ হওয়ার আওয়াজ। কিছুক্ষণ পর সব শব্দই আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গেলো। মণি মাসি বুঝলেন যিনি বা যারা এসেছে তারা এখন ঘরেতে সেটল করে গেছে। তবুও করিডোরের আলো জ্বলছে। মণি মাসির আবার ঘুমোবার সময় একটুও আলো সহ্য হয় না ....মানে আলো জ্বললে ঘুম আসে না। ভাবলেন একবার ইন্টারকমে বাচ্চুকে ডেকে বলবেন করিডোরের আলোটা নেভাতে। হাত বাড়াতেই যাচ্ছিলেন কিন্তু সেই মুহূর্তেই করিডোরে পুরুষ কণ্ঠে কে যেন গেয়ে উঠলো ....

তোমারই ঝর্ণা তলার নির্জনে
মাটির এই পরশ আমার

মাঝ রাতে...? দরাজ গলায় কে গান গায়? মণি মাসি কৌতূহল চাপতে না পেরে উঠে দরজা খুলে উঁকি মারলেন। করিডোরে কেউ নেই....তার পর মুহূর্তেই অন্ধকার। কে যেন টুপ করে আলোটা নিবিয়ে দিলে।

মণি মাসি দরজা বন্ধ করে খাটে এসে শুয়ে পড়লেন। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আর আসে না। এপাশ ওপাশ করে, মাথার উপর গায়ে চাপা দেওয়ার  চাদরটা  টেনে, অনেক ক্ষণ নানান রকমের চিন্তা করতে করতে কখন জানি চোখ দুটো বুজে এলো। ঠিক ঘুমটা আসবে আসবে করছে সেই মুহূর্তে মণি মাসির হঠাৎ খেয়াল হলো উনি ভুল শোনেননি। করিডোরে কেউ তো ছিল। উনি সিগারেটের গন্ধ পেয়েছিলেন।

তৃতীয় দিন সকালে মণি মাসি ঘুম থেকে উঠে স্নান ইত্যাদি সেরে খাবার ঘরে পৌঁছে বাচ্চুকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন কাল রাতে কে বা কারা বাংলোতে এসেছে। বাচ্চু বললো, " কই না তো কেউ তো আসেনি  মাসি।" মণি মাসি জোর দিয়ে বললেন, " তবে যে করিডোরে আলো জ্বলছিল মাঝ রাতে?" বাচ্চু বললো, "ও সে তো মাঝে মাঝেই জ্বালিয়ে দেখতে হয়। কাল রাতে আওয়াজ পেলাম মনে হলো। জংলী জানোয়ার মাঝে মধ্যেই বাংলোতে এসে পড়ে।  আলো জ্বালালে আবার পালিয়ে যায়।" এরপর মণি মাসি আর গানের কথা তুললেন না । ব্রেকফাস্ট সেরে হাঁটা দিলেন ঝর্নার ধারে ।

এই জায়গাটা সত্যিই সুন্দর। সবুজ মাঠ পেরিয়ে এক ফালি রাস্তা বেয়ে একটু নেমে গেলেই ঝর্নার ধার। আর যদি নিচে না নাম তো মাঠ পেরিয়ে উল্টো দিকে সোজা গেলে বড় রাস্তা। রাস্তা পেরিয়ে পনেরো মিনিট মতন হাঁটলে দোকানের সারি। রোজকার জিনিস। সবজি পাতি। মাছ মাংসর বাজার। শোর গোল...ভিড় ও বটে। কাছে পিঠে গ্রাম বা ছোটখাটো বসতি থেকে লোকেরা আসে দোকান বসাতে আর খরীদারি করতে ও। মণি মাসি ওদিকটা একবার গেছিলেন। ভালো লাগেনি বাজার হাটের চিল্লামেল্লি। এই সব থেকে বাঁচার জন্যেই তো এখানে আসা। ঝর্নার ধারে বসে জলের কলকলানি শোনা। পাখিদের গান আর মিষ্টি ফুলের সুবাস মাখো গায়ে। ফুরফুরে হাওয়া বয়ে আনে নাম না জানা ফুলের  গন্ধ। মণি মাসি পাখিদের নাম জানেন না, ফুলের গন্ধ চিনতে পারেন না। এখানে সবই অচেনা। তিনি ও এখানকার বাসিন্দাদের কাছে একজন অচেনা মানুষ। এই তো তিনি চান। অচেনা হয়ে থাকতে। এই জায়গাটার নামটাও এক্কেবারে মানানসই - অচিনপুর।

আজকে কিন্তু তিনি একা নন। একটা পাথরের উপর বসে ডান দিকে মাথা ঘোরাতেই দেখলেন কালকের সেই ভদ্রলোকটিকে। কিছু দূরে আরেকটা বড় পাথরের উপর বসে নির্নিমেষ চোখে ঝর্নার ওপারে একটা ঝাঁকড়া গাছের দিকে চেয়ে আছেন। যেন ধ্যানস্থ। নি:শ্বাস ও পড়ছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। গলায় সেই বাইনোকুলার। পরনে সেই নীল টি শার্ট, ছাই রঙ্গা প্যান্ট আর পায়ে সাদা স্নিকার। মণি মাসির মনে হলো ভদ্রলোকটিকে ডিস্টার্ব করা অনুচিত হবে। মিনিট খানেক ঝর্নার জলে পা ডুবিয়ে বসে থেকে মণি মাসি উঠে এলেন। আজ না হয়  বাংলোর পিছন দিকটা ঘুরে দেখবেন।

মাঠ পেরিয়ে বাংলো। ছিমছাম, পরিষ্কার একতলা বাড়ি। একটা ছোটো বাগান দিয়ে ঘেরা। বাংলোর চার পাশের দেয়ালটা বেশ নিচু। বাচ্চু ঠিক বলেছিল। জংলী জানোয়াররা পাঁচিল টপকে ভিতরে আসতেই পারে। বাংলোর পিছন দিকটায় বিশেষ কিছুই নেই। খালি রাস্তা বাস ডিপোর দিকে চলে গেছে।

লাঞ্চের সময় হয়ে গেছে। মণি মাসি বাংলোয় ফিরে এলেন। ম্যানেজার বাবু "আজ কোথায় কোথায় ঘোরা হলো" বলে আলাপ জমাতে এলেন। মণি মাসি জানালেন ওনার বাজার হাট, বড় রাস্তা, মাঠ সব ঘোরা হয়ে গেছে। তবে ঝর্নার ধারটা সব চেয়ে ভালো লেগেছে বলাতে, ম্যানেজার বাবুর হাঁসিখুশী মুখটা যেন একটু গম্ভীর হয়ে গেলো। "ও দিকটা একটু সাবধানে যাবেন। ঝর্নার ধারের পাথর গুলো বড় পিছল আর অনেক সময় অনেক জংলী জানোয়াররা ওখানে জল খেতে আসে। আপনার বয়স হয়েছে....।" মণি মাসি  এই বয়সের ইঙ্গিতটা ঠিক বুঝলেন না। জংলী জানোয়াররা কি অল্প বয়স্কদের অ্যাটাক করবে না। উনি আর কথা বাড়ালেন না। আচ্ছা বলে লাঞ্চের অর্ডার দিতে ভিতরে চলে গেলেন।

বিকেলে আবার সেই ঝর্নার ধার মণি মাসিকে যেন বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকে। তবে এবার সেখানে পৌঁছে মণি মাসি রীতিমত অবাক হলেন। ঝর্নার ওধারে যেই ঝাঁকড়া গাছটাকে নীল টি শার্ট পরা ভদ্রলোক নিস্পলক চোখে ঝর্নার এপারে বসে দেখছিলেন সেই গাছেরি ছায়ায় বসে উনি অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে একটি বই পড়ছেন। গলায় বাইনোকুলার তো আছেই। মণি মাসি বুঝে উঠতে পারলেন না ভদ্রলোক ওপারে গেলেন কি ভাবে? ঝর্নাটার গভীরতা কম। কিন্তু তোর অনেক বেশি। জল স্বচ্ছ । তাই জলের নিচে ছোট বড় অনেক পাথর পরিষ্কার দেখা যায়। ভদ্রলোক যদি ঝর্নার উপর দিয়ে হেঁটেও পার হয়ে থাকেন তবে ও স্লিপ করার চান্স অনেক বেশী কারণ কোনো গাছের ডাল বা এমন কোনো জিনিস নেই যার উপর ভর করে ঝর্ণা পার হওয়া যায়। আর একবার স্লিপ করলে জলের প্রবাহে বয়ে যেতে দেরি লাগবে না। মণি মাসির মনে পড়ে গেলো প্রথম আলাপের পর্বে ভদ্রলোক হন হন করে ঝর্নার ধার দিয়ে উল্টো দিকে রওনা হয়েছিলেন। মণি মাসি ঠিক করলেন কাল ভোরে বেরিয়ে ঝর্নার ধার ধরে হেঁটে এগিয়ে গিয়ে দেখবেন ওপারে যাওয়ার কোনো রাস্তা আছে কি না। এখন সূর্য প্রায় ঢল ঢল। মণি মাসি বাংলোর দিকে রওনা হলেন।

কিন্তু পরের দিন মণি মাসির আর ঝর্নার পারে যাওয়া হলো না। ঘুম থেকে উঠেই কিরকম গা ম্যাজম্যাজ করে উঠলো। আর মাথায় অসম্ভব যন্ত্রনা। একটা প্যারাসিটামল খেয়ে মণি মাসি সটান বিছানা নিলেন। ঝর্নার ঠাণ্ডা জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকার দরুনই হোক বা সকাল বেলার ফুরফুরে হওয়ায় ঘুরে বেড়ানোর দরুনই হোক মণি মাসির চতুর্থ দিনের সোলো ট্র্যাভেল বাংলোয় নিজের ঘরে শুয়েই কাটাতে হলো। পরের দিন বাড়ি ফেরার কথা তাই আর কোনো রিস্ক না নিয়ে ঝর্নার ধার দিয়ে নতুন কোনো পথের সন্ধানে বেরোনোর অ্যাডভেঞ্চারটা ট্র্যাভেল আইটিনেরারি থেকে বাদ দিতে হলো।

পঞ্চম দিন সকাল দশটার মধ্যে রেডি হয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে ব্যাগ গুছিয়ে এগারোটার বাসটা ধরবার জন্য মণি মাসি বাস ডিপোতে হাজির হলেন। বাস ডিপো মানে একটা টিকিট ঘর। তার দু পাশে দুটো অশ্বত্থ গাছ হেলে পড়ার দরুন টিকিট ঘরটার সামনে পাতা কয়েকটা পাথরের বেঞ্চগুলো ছায়াকীর্ণ। পঁচিশ মিনিট বসার পর বাস এল। ম্যানেজার বাবু বলে দিয়েছিলেন বাস পনেরো কুড়ি মিনিট থামে। তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। মণি মাসি ব্যাগ হাতে করে বাসের দিকে রওয়ানা দিলেন। কোন বইতে পড়েছিলেন ওয়ান শুড ট্র্যাভেল লাইট তাই একখানা ব্যাগেই মণি মাসির যাবতীয় দরকারি জিনিস গুছিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। ব্যাগ বেশি ভারিও নয়। আর দু কদম.... হঠাৎ পিছন থেকে একটি পরিচিত ভারি কণ্ঠস্বর, "চললেন?" মণি মাসির চিনতে সময় লাগলো না কণ্ঠ স্বরটি কার? মনে হলো যেন তিনি সেই স্বরটি শোনার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। পিছন ফিরে আবার সেই আড়ষ্ট ভাবে ঘাড় নাড়িয়ে হ্যাঁ জানালেন। মণি মাসি এগারো বারো ক্লাসের বেয়াড়া ছেলে মেয়েদের চিরকাল ভীতির পাত্রী ছিলেন। কিন্তু এই সহজ, আলাপি ভদ্রলোকের সামনে একজন শাঠত্তর মহিলার এমন সলজ্জ ব্যবহারের কারণ মণি মাসি নিজেও বোধহয় বিশ্লেষণ করে উঠতে পারলেন না। ভদ্রলোকের কাঁধেও একটা  ওভারনাইটার দেখে বুঝতে অসুবিধে হলো না যে উনি ও বাড়ি ফেরার তাগিদে। "যাক, কিছুদিন ভালো কাটলো তো?" উত্তরের অপেক্ষা না করেই ভদ্রলোক গুড লাক বলে এগিয়ে গেলেন দাঁড়ানো বাসটার পিছন দিকে। মণি মাসি খেয়াল করেননি ততক্ষণে আরেকটা বাস এই বাসটার পিছন দিকে এসে দাঁড়িয়েছে।

বাসে চড়ে জানালার পাশের একটা সিটে মণি মাসি গুছিয়ে বসলেন। ছ ঘণ্টার পথ। পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল হয়ে যাবে। তাও যদি বাসটা ঠিক সময় ছাড়ে। এরই মধ্যে আরেকজন যাত্রী উঠে মণি মাসির পাশের সিটটি দখল করলো। লোকাল মনে হয়। পাজামার উপর চেক কাটা বুশ শার্ট  পড়া। মাথায় টাক। টাকের তিন পাশে কাঁচা পাকা ছোটো ছোটো চুল। তার মধ্যে শুধু দু তিন গাছি চুল লম্বা যেটা দিয়ে টাক টাকে ঢাকার লোকটা ব্যার্থ চেষ্টা করেছে। গায়ের রং পীত বর্ণ আর চোখ দুটো অসম্ভব রকমের বড় আর গোল গোল। মণি মাসির এই প্রথম কাউকে দেখে বিরক্তি এট ফার্স্ট সাইট জন্মালো। লোকটার একটু হে হে ভাব আর গায়ে পড়ে আলাপ জমানোর চেষ্টা। মণি মাসি সিট টা বদলাবেন কিনা ভাবলেন। তারপর মত পরিবর্তন করলেন। সিট বদলালেই যে ভাল কো - প্যাসেঞ্জার পাবেন তার কি মানে?

ভদ্রলোকের নাম গোরক্ষনাথ ঘোষাল। নিজেই জানালেন। মণি মাসির খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পুরো হরোস্কপ বাস চলার সঙ্গে সঙ্গে জেনে নিয়েছেন। মণি মাসির হঠাৎ খেয়াল হলো তিনি কিন্তু সেই অচেনা আলাপি ভদ্রলোকের সম্বন্ধে কিছুই জানেন না। তিনিও কিন্তু মণি মাসির আদ্যোপান্ত কিছুই জানার চেষ্টা করেননি। কতবার  তো দেখা হলো। তার ঠিক বিপরীত এই 
গোরক্ষ বাবু।

মণি মাসি ডাক বাংলোয় উঠেছিলেন তায় আবার একলা শুনে ওনার গোল গোল চোখ আরো গোল গোল হয়ে গেলো। তারপর কোন কোন জায়গা ঘুরেছেনের লিস্টে ঝর্নার ধারের কথা শুনে লোকটি যেন কেমন চুপসে গেলেন। বেশ কিছু ক্ষণ চুপ করে থেকে একটু আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার সঙ্গে ঝর্নার ওদিকটা কোনো ইয়ে মানে অঘটন - টঘটন ঘটেনি তো?" মণি মাসি বেশ জোর গলায় বললেন, " কই না তো।" লোকটি আবার আরেকটু বেশী আমতা আমতা করে বলল, "না মানে কয়েক বছর আগে এক গাছপালাবিদ প্রফেসর ওই ঝর্নার ধারটা তেই পিছল পাথরে পা পিছলে মারা যান কিনা।শোনা যায় প্রায়ই নাকি ওধারে তাকে দেখা যায়। তাই কেউ আর ওদিকটা সচরাচর যায় না। আপনার ঐ ডাকবাংলোতেই তো উনি উঠেছিলেন। আপনি ওদিকটা এতোবার গেছেন কাউকে.... " শেষের দিকটা মণি মাসি পরিষ্কার শুনতে পারলেন না। বাস চালক ভীষণ জোরে হর্ন বাজিয়ে হঠাৎ হ্যাঁচকা একটা ব্রেক কষে বাস টাকে ডান দিকে স্পীডের সঙ্গে ঘোরালো আর সেই ঝটকার চোটে মণি মাসি সামনের সিটের রডের উপর প্রায়: হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে বেঁচে গেলেন।

"এ্যাই ভোলা ঠিক করে চালানা..." লোকটি কথা থামিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো।

ভোলা ড্রাইভার আরো চেঁচিয়ে জবাব দিলে,"কী করবো গরখোদা... হঠাৎ একটা ছাগলের বাচ্চা মাঠ থেকে ছুটে রাস্তায় চলে এসেছিল। ওটাকেই তো বাঁচানোর জন্য গাড়িটাকে এমন করে ঘোরাতে হলো।"

মণি মাসির আবার গা ম্যাজ ম্যাজ করছে। হাতব্যাগ হাতড়িয়ে একটা প্যারাসিটামল বের করে বোতল থেকে জল নিয়ে গিললেন। বাড়ি অবধি জার্নিটা ঘুমিয়ে কাটাতে পারলে ভালো হয়।


(পিকটি গুগল থেকে নেওয়া )