Sunday, August 31, 2025

প্রতিবেশী



আমার ঠিক পাশের বাড়ি।  বাড়ি নয়। একতলার ফ্ল্যাট। আমারও ওদেরও। শুধুমাত্র একটাই দেওয়ালের ব্যবধান। দেওয়ালের উপর রেলিং। রেলিংটা ডিঙ্গোতে পারলেই ওদের ফ্ল্যাটের বাড়ানো ববারান্দায় গিয়ে পড়বো।  

রেলিং কিন্তু কখনোই ডিঙ্গোইনি। 

কথাও খুব একটা বেশি হয় না । ওই মাঝে মধ্যে "কি কেমন আছেন?  ভালো?" এই ধরনের আদান প্রদান। কিন্তু ওই বাড়ির বৌদিকে দেখেছি সকাল সকাল  ভেজা কাপড়গুলো বারান্দায় মেলতে। দেখে মনে পড়ে গেছে আমাকেও কাপড় ধুয়ে মেলতে হবে। ওদের বাড়ির কাজের লোকটি ঠিক আসে দুপুরে। এই বারোটার থেকে একটার মধ্যে। আমি ভিতর ঘর থেকেই আওয়াজ পাই। তারপর তার বারান্দা ধোয়ার শব্দ শুনে মনে হয় সবকিছু ঘড়ির কাঁটার তালে তালে চলছে। 

আশ্বস্ত হই।

রাত্রে সদর দরজায় তালা লাগাতে গিয়ে এক ফাঁকে ওদের দরজার দিকে উঁকি মারি। আমার ব্যালকনি থেকে ওদের দরজাটা দ্যাখ যায়। না: ! আলো জ্বলছে। লোহার জাল দেওয়া দরজাটা ভ্যাজানো। কিন্তু ভিতর ঘরের মানে বসবার ঘরের কিছুটা অংশ দ্যাখা যায় যতক্ষণ না কাঠের দ্বিতীয় দরজাটা বন্ধ করা হয়। আমার ফ্ল্যাটেরো ওই রকমই প্যাটার্নের দরজা। 

লোক দ্যাখা যায় না বটে কিন্তু মৃদু গলার শব্দ পাই। কথার টুকরো ছুটে আসে। নিঃশ্বাস ফেলি। সব ঠিক আছে। ঘড়িতে বাজে দশটা। 

নিশ্চিন্ত হই।

***

কিছুদিন হলো ওদের ফ্ল্যাটের দরজাটা বন্ধ। কাঠের দরজাটাও। মহিলাকেও দেখতে পাচ্ছি না। ভেজা কাপড় দড়িতে ঝুলছে না। ওনার আবার ফুঁসফুসের ব্যামো আছে। প্রায়:সই দমকা কাশির আওয়াজ পাই। বেশ কিছুদিন সেই আওয়াজটাও পাচ্ছি না। 

ভাবি মেয়ের বাড়ি হয়তো বেড়াতে গেছেন। বা হয়তো ছেলের কাছে। অস্ট্রেলিয়ায়? ছেলের বউয়ের সাথে তেমন বনিবনা ছিল না। কিন্তু দুরত্বে মনের টান বাড়ে। হয়তো নাতনির কথা মনে পড়ে গিয়ে মন কেমন কেমন করে উঠেছে। দুপুরে বেলা কাজের মেয়েটি কিন্তু রোজ আসছে। হয়তো ওর কাছে বাড়ির চাবি দেওয়া আছে। অনেকদিনের বিশ্বস্ত কাজের লোক!

দীর্ঘনিশ্বাস ফেলি।

***

মনটা উদাস হয়ে গেলো। বিদেশ মানে তো মাস খানেকের ধাক্কা। 

একা একা লাগে। ব্যালকনিতে আর বসি না । ভয় ভয় করে। আমিতো একা থাকি। পাশের বাড়ির ওরা না থাকাতে ভরসা পাই না। কিসের ভরসা ? 

যদিও আগেই বলেছি খুব একটা আলাপচারিতা হতো না। কিন্তু তবুও মানুষের নীরব উপস্থিতিও প্রতিদিনকার জীবন যাত্রার একটা বিশাল  জায়গা জুড়ে থাকে। পাড়াটা বড়ই চুপচাপ মনে হচ্ছে। সন্ধ্যার পর নিঃশব্দতা যেন আরো গাঢ় হয়ে উঠছে। ছোটখাটো খুটখাট শব্দগুলোও নির্জনতা ভেদ করে শেলের মতো বিঁধছে। অদ্ভুত এক ভয়াবহ পরিবেশ সৃষ্টি করছে। 

ভাবছি কিছুদিনের জন্য অন্য কোথাও ঘুরে আসব। বন্ধুর বাড়ি। বা কোনো আত্মীয়র কাছে। কিন্তু সবাই আজকাল বড় ব্যস্ত। সময়ের সবার কাছে বড় অভাব।

***

কাল দুপুরে শুনি পাশের ফ্ল্যাটের সদর দরজা খোলার আওয়াজ। কাজের মেয়েটি বোধহয় এসেছে। কান লাগিয়ে আরেকবার শুনি। কেউ যেন দরজা খুলে দিল মনে হলো। চাবি ঘোরানোর আওয়াজ তো পেলাম না।

বাইরে বেরিয়ে দেখি মেয়েটি বারান্দা ধুচ্ছে। ভাবলাম জিজ্ঞেস করি। তারপর ভাবলাম যদি কিছু মনে করে। তাই আর প্রশ্ন করি না। যাওয়ার সময় মনে হলো কেউ যেন দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করলো। তাহলে কি ওরা আছে?

***

পরের দিন সকালে মহিলার গলার আওয়াজ পেলাম। বাইরে বসে স্বামী স্ত্রী দুজনে চা খাচ্ছেন। ফ্ল্যাটের দরজাটাও খোলা। আসতে যেতে নজরে পড়ছে। কাজের মেয়েটি দুপুরে এসেছে। মহিলার সঙ্গে কথাবার্তাও টুকটাক চলছে। সংসারের নানান আলাপ আলোচনা ভেসে আসে। 

ঘড়ি দেখি। মিনিটের আর সেকেন্ডের কাঁটাগুলো নিজেদের তালে তালে ঠিক চলেছে। ন পিসিকে বলেছিলাম সপ্তাহ খানেকের জন্যে ঘুরে যাবো। ভাবছি আজ ফোন করে যাওয়ার প্রোগ্রামটা ক্যান্সেল করে দেব।

কি বলেন?






No comments:

Post a Comment